মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২০, ০৩:৩৫ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল!

একটি বিখ্যাত প্রবাদ বাক্য- রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল।

প্রবাদ বাক্যটির নিরো আসলে কে?

আসলে নিরো ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের পঞ্চম সম্রাট। জুলিও-ক্লডিয়ান রাজতন্ত্রের সর্বশেষ রোমান সম্রাট এই নিরো।

তবে নিরো সম্ভবত রোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে অজনপ্রিয় সম্রাট ছিলেন। হত্যা, রক্তপাত তার প্রিয় বিষয়বস্তু। অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা সম্রাট নিরো।

এমনকি ক্ষমতার জন্য নিজের মাকেও হত্যা করেন তিনি। বিষ খাইয়ে মেরেছেন সৎভাই ব্রিটানিকাসকে।

এ ছাড়া প্রচলিত আছে- নিরো নাকি তার প্রথম স্ত্রী অকটাভিয়াকেও হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং দ্বিতীয় স্ত্রী পপ্পেয়াকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় লাথি মেরে হত্যা করেন।

রোমের যে অগ্নিকাণ্ডের কথা বলা হয়, সেটি ঘটেছিল ১৯ জুলাই, ৬৪ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে। এটি ছিল রোমের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ অগ্নিকাণ্ড। ছয় দিন ধরে আগুনের শিখা জ্বলতে থাকে। রোমের ১৪ জেলার ১০টিই আগুনে পুড়ে যায়।

রোমবাসীর ধারণা, এই অগ্নিকাণ্ড সম্রাট নিরো নিজেই ঘটিয়েছিলেন। কারণ ধ্বংসস্তূপের জায়গায় তিনি তার অবিস্মরণীয় স্থাপত্যকর্ম ‘ডোমাস অরিয়া’ বা স্বর্ণগৃহ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন।

এ ধারণা আরও সত্য প্রতীয়মান হয়, যখন দেখা যায় যে অগ্নিকাণ্ডের পর ধ্বংসস্তূপে নিরো তার স্থাপত্যকর্ম তৈরির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন।

এর জন্য তার প্রচুর অর্থের দরকার হয়ে পড়েছিল। ফলে তিনি কর বাড়ান। মন্দিরগুলো থেকে অর্থ তুলতে শুরু করেন। অনেকের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে শুরু করেন।

তা ছাড়া ইতিহাসে উল্লেখ আছে, রোম যখন আগুনে পুড়ছিল, নিরো তখন তার প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেহালা বাজাচ্ছিলেন।

নিরো অভিযোগ করেন যে, খ্রিস্টানরাই এই আগুন লাগিয়েছিল। এটি তিনি করেছিলেন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে।

ওই সময়ে রোমে খ্রিস্টানদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। তারা ছিল প্রান্তিক এবং অজনপ্রিয়।

বলা হয়, শহরে আগুন দেয়ার শাস্তি হিসেবে খ্রিস্টানদের অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিলেন নিরো। তাদের ক্রুশবিদ্ধ করা হয়, বন্য জন্তু দিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয় এবং তাদের শরীরে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

এখানেই শেষ নয়, এসব শাস্তি দেয়ার সময় উৎসবও করা হতো। লোকজনকে আমন্ত্রণ জানানো হতো এসব প্রত্যক্ষ করার জন্য।

কিন্তু প্রচলিত এসব গল্পের কিছু সমস্যা আছে। যেমন- প্রাচীন রোমে বেহালার অস্তিত্ব ছিল না। সংগীতের ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাদের দাবি ১১ শতাব্দীর আগে বেহালা আবিষ্কার হয়নি।

যদি নিরো কিছু বাজিয়ে থাকেন, সেটি হয়তো কিথারা হতে পারে, যা চার থেকে সাত স্ট্রিংয়ের ভারী কাঠের তৈরি সুরযন্ত্র।

তবে এতে প্রমাণিত হয় না যে, নিরো আসলেই অগ্নিকাণ্ডের সময় কোনো যন্ত্র বাজাচ্ছিলেন। কারণ প্রাচীন রোমের ইতিহাসবিদ ট্যাসিটাস অগ্নিকাণ্ডের সময় নিরো রোম থেকে ৩৫ মাইল দূরে এন্টিয়াম শহরে ছিলেন।

আগুনের খবর শুনে তিনি দ্রুত রোমে ফিরে যান। ত্রাণকার্যক্রম শুরু উদ্যোগ নেন। নিজস্ব তহবিল থেকে এর যাবতীয় ব্যয়ভারও তিনি গ্রহণ করেন।

এমনকি যে প্রাসাদে দাঁড়িয়ে তিনি বেহালা বাজাচ্ছিলেন বলে গুজব প্রচলিত, সেখানে তিনি বরং গৃহহীনদের আশ্রয় দেন। তাদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন এমনটাই বলেন ইতিহাসবিদ ট্যাসিটাস।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে ট্যাসিটাস নিজে কিন্তু একদমই নিরো সমর্থক ছিলেন না। তিনি বরং ব্যক্তিগতভাবে নিরোর অন্যান্য অপকর্মের জন্য ঘৃণা আর ধিক্কার পোষণ করতেন।

তা হলে নিরো সম্পর্কে কেন এই গুজব ছড়ানো হয়েছিল? যা আবার এমনই এক গুজব যেটি পাঠ্যপুস্তকে পর্যন্ত প্রবাদবাক্য হিসেবে বহুল প্রচলিত হয়ে গিয়েছে?

বস্তুত সম্রাট নিরো রোম পুড়ে যাওয়ার সময় বেহালা বাজাচ্ছিলেন এই কথাটি ছড়ানো শুরু হয় ওই অগ্নিকাণ্ডের দেড়শ বছর পর থেকে। আর এই কাহিনীটি রচনা করেছিলেন ক্যাসিও ডিও।

আর এই গুজবটি মানুষকে বিশ্বাস করতে শুরু করে নিরোর কারণেই। তিনি অগ্নিকাণ্ডের পর ধ্বংসস্তূপের ওপরই তার স্বপ্নের ডোমাস অরিয়া বা স্বর্ণগৃহ নির্মাণ শুরু করেন। আর এই ডোমাস অরিয়া স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন।

নিরোর বয়স ৩০ হতে হতেই তার বিরুদ্ধে বিরোধিতা চরমে পৌঁছায়। সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে সেনেট তাকে ‘জনগণের শত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর অর্থ হচ্ছে- নিরোকে যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই তাকে হত্যা করা হবে।

এর পর নিরো মফস্বলের মতো একটি জায়গায় পালিয়ে গিয়ে সেখানকার একটি ভিলাতে আশ্রয় নেন। রক্ষীরা যখন তার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন তিনি আত্মহত্যা করেন।

error20
fb-share-icon0
Tweet 10
fb-share-icon20


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
error: Content is protected !!