রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২০, ০২:০১ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

রোহিঙ্গা সমস্যার তিন বছর

image_pdfimage_print

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান মো. শামসুদ্দীন : মিয়ানমারে ২৫ আগস্ট ২০১৭ সালের সেনা অভিযান ও রাখাইন প্রদেশে গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা প্রাণভয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এই ঘটনার তিন বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। এই বিশাল নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রথম সময়সীমা ঠিক হয়েছিল। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রস্তুত ছিল কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাখাইনে প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয় নাই বলে ঘোষণা দেওয়ায় প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়। এর প্রায় এক বছর পর ২২ আগস্ট ২০১৯ সালে দ্বিতীয় বারের মতো প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুতি নেয়। মিয়ানমার ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের এই উদ্যোগও সফলতার মুখ দেখেনি। এ সময় ইচ্ছার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হতে পারে বলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যেকার প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং সম্মানজনকভাবে এবং রোহিঙ্গাদের প্রমাণ করতে হবে তারা রাখাইনের বাসিন্দা ছিল। প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পক্ষে এটা প্রমাণ করা কঠিন, কারণ বহু বছর তারা নাগরিকাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। যেসব রোহিঙ্গার কোনো না কোনো সনদ ছিল তা তাদেরকে জমা দিয়ে নতুন নাগরিকত্ব সনদ দেওয়ার কথা বলা হলেও কখনো তা দেওয়া হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব, ক্ষতিপূরণ ও নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার ছাড়া মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী নয়। এসব দাবি পূরণে মিয়ানমার এখন পর্যন্ত কোনো প্রচেষ্টা নেয়নি। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যা তৃতীয় বছরে পদার্পণ করল।

২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর গণহত্যার অপরাধ, প্রতিরোধ ও সাজাবিষয়ক সনদ লঙ্ঘিত হয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে গাম্বিয়া ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) আদালতের রেজিস্ট্রারের কাছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন জানায়। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশটির চলমান নিপীড়নমূলক আচরণ বন্ধে গাম্বিয়ার মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আইসিজে ২৩ জানুয়ারি ২০২০ একটি জরুরি ‘সাময়িক পদক্ষেপ’ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। এই আদেশ জারির দিন থেকে চার মাসের মধ্যে মিয়ানমার আদালতের আদেশ অনুযায়ী যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে, সেগুলো আদালতকে জানানো এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রতি ছয় মাস পরপর এ বিষয়ে প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ ছিল। গণহত্যা সনদ মেনে চলা এবং রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত সব সহিংসতার সাক্ষ্য-প্রমাণ সংরক্ষণের জন্য মিয়ানমার সরকার গত ৮ এপ্রিল ২০২০ তারিখে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে দুটো আলাদা আদেশে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় মিয়ানমার গত মে মাসের শেষে আইসিজেকে প্রথমবারের মতো প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

রোহিঙ্গা সমস্যার মতো একটা জটিল ও চলমান সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো প্রয়োজন। এর পাশাপাশি দুই দেশের নাগরিক সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে আস্থার অবস্থা সৃষ্টি করা দরকার। মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত চীন, ভারত ও জাপান—এই তিনটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেরও সুসম্পর্ক রয়েছে, তাই মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে কাজ করতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যার মূল সমাধান, অর্থাত্ রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের কোনো প্রচেষ্টা সফলতার মুখ দেখেনি। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থা ফেরানোর ওপর মূল মনোযোগ দেওয়া উচিত। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ সবার উপস্থিতি আছে, অথচ মিয়ানমারের রাখাইনে কারো উপস্থিতি নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাখাইনে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা জোরদার করতে হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে চীন, ভারত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০ দেশের আঞ্চলিক জোট আসিয়ানসহ বিভিন্ন দেশ ও পক্ষকে যুক্ত করে তাদের সবার সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশকে এগোতে হবে এবং যথাযথ ক্ষমতা দিয়ে রাখাইনে পাঠানো নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের মতো মূল দুটি বিষয়ে সুরাহা হলেই অনেক সমস্যার সমাধান হবে।

এখনো দাতা সংস্থাগুলো তাদের সাহায্য অব্যাহত রেখেছে বলে এই সমস্যা আরো বিশাল আকার ধারণ করতে পারছে না। বর্তমানে বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯-এর ছোবলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সমস্যা ভারাক্রান্ত, সেই দেশগুলো তাদের নিজস্ব সমস্যা সমাধান করে এই দূর দেশের রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কত দিন তাদের সাহায্য অব্যাহত রাখবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। মিয়ানমার-সৃষ্ট এই সমস্যা বাংলাদেশকেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাধানের আগে পর্যন্ত জাগিয়ে রাখতে হবে। রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারের সমান অধিকার প্রাপ্ত নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিশ্ববাসীর নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া উচিত। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান দ্রুত থেকে দ্রুততর হোক—বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব এবং রোহিঙ্গারা সেই আশার পথে তাকিয়ে আছে।

লেখক :এনডিসি, এ এফ ডব্লিউ সি, পি এস সি, ডেপুটি কমান্ড্যান্ট, বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা, গাজীপুর

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!