শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২০, ১০:০৮ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

সব অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে ‘ই-কোলাই’

প্রাণসংহারী জীবাণুর হাত থেকে মানুষের জীবন রক্ষা করে যে অ্যান্টিবায়োটিক, সেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে বেশির ভাগ প্রাণসংহারী জীবাণু। এ কারণে বিশ্বে বছরে কয়েক মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ঘটে। এভাবে চলতে থাকলে অ্যান্টিবায়োটিক জীবাণুর কারণে ২০৫০ সালে বিশ্বে ১ কোটি লোকের মৃত্যু ঘটবে।

এমন তথ্য জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। সম্প্রতি ‘ফাইন্ডিংস ফ্রম অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টেন্স সার্ভিলেন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে ভয়াবহ এ তথ্য প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশের ৯টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাণসংহারী জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ক্ষমতা নিয়ে এ গবেষণা চালানো হয়।

গবেষণা দলের প্রধান আইইডিসিআর’র মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রিন্সিপাল সায়েন্টেফিক অফিসার ডা. জাকির হোসেন হাবিব বলেন, ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া প্রায় সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। ‘ইমিপেনেম’ অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া।

এই জীবাণু সাধারণত তিনভাবে মানবদেহে সংক্রমণ ঘটিয়ে মানুষের মৃত্যু নিশ্চিতে কাজ করে- মূত্রনালির মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটিয়ে, কাটা বা ক্ষতস্থানে সংক্রমণ ঘটিয়ে এবং আইসিইউতে রোগীর শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটিয়ে।

এছাড়া ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া ‘অ্যামিকাসিন’ অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ, ‘নাইট্রোফুরানটন’-এর ক্ষেত্রে ৭৭ শতাংশ, ‘জেনটামাইসিন’-এর ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।

এমনকি বছরখানেক আগে বাজারে আসা পঞ্চম প্রজন্মের সর্বাধুনিক অ্যান্টিবায়োটিক ‘সেফিপিম’র ক্ষেত্রেও ৪৫ শতাংশ প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে এই জীবাণু। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় পিডিআর বা প্যান ড্রাগ রেজিস্টেন্স।

অন্যদিকে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে মূত্রনালির সংক্রমণ ঘটনো জীবাণু ‘প্রটিয়াস’, ‘সিউডোমোনাস এরোজিনোসা’, ‘অ্যাসাইনোটা ব্যাক্টর’, টাইফয়েট ও প্যারাটাইফয়েডের জীবাণু ‘সালমোনেলা’, রক্ত আমাশার জীবাণু ‘সাইগেলা’, কলেরার জীবাণু ‘ভাইব্রো কলেরা’।

ডা. জাকির বলেন, এসব জীবাণুর কোনোটি এমডিআর বা মাল্টি ড্রাগ রেজিস্টেন্স, কোনটি এক্সডিআর বা এক্সটেনসিভ ড্রাগ রেজিস্টেন্স (এমডিআরের চেয়ে বেশি প্রতিরোধী)। ফলে এখন যে রোগই হোক না কেন নিশ্চিন্তে ওষুধ খাওয়ার মতো অবস্থা আর নেই।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা যুগান্তরকে বলেন, জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠা অত্যন্ত আতঙ্কের বিষয়।

একজন মানুষ হাসপাতালে সংক্রমিত অবস্থায় থাকবে অথচ কোনো ওষুধই তার কাজে আসবে না- এর চেয়ে নির্মম আর কিছুই হতে পারে না। তাই এ বিষয়ে সর্বোচ্চ জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিটেন্স অবস্থা থেকে দেশকে ও দেশের মানুষকে নিরাপত্তা দিতে হলে অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা বন্ধ করতে হবে। জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের প্যাকেট লাল রঙের করা যেতে পারে।

যাতে প্যাকেট দেখেই সবাই বুঝতে পারে এটি অ্যান্টিবায়োটিক। এটি ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কেনা বা বিক্রি নিষিদ্ধ। এছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের প্যাকেটে কমপক্ষে ততগুলো ওষুধ রাখতে হবে, যাতে একটি কোর্স সম্পন্ন হয়। তাহলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিটেন্স কিছুটা হলেও এড়ানো সম্ভব।

তারা বলেন, মারা যাওয়া রোগীদের পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তাদের শরীরে পাওয়া ব্যাকটেরিয়াগুলোর ৭০-৮০ ভাগই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী- এটা আমাদের জন্য ভয়ংকর খবর, যা থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয়, দেশজুড়েই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সের অবস্থা খুবই খারাপ।

ধারাবাহিকভাবে ১৫ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, দেশের অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসছে। যে অ্যান্টিবায়োটিকগুলো ৫-১০ বছর আগে খুবই কার্যকর ছিল, সেগুলোর প্রায় কোনোটিই এখন আর তেমন কার্যকর নয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান খসরু বলেন, প্রতিদিন প্রায় ১০-১৫ লাখ মানুষকে অপ্রয়োজনে বা ভুলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হচ্ছে। এভাবে বিক্রি হলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স ডেভেলপ করা খুব স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রায় আড়াই লাখ ফার্মেসি আছে, যাদের বড় অংশই অনিবন্ধিত। এই ফার্মেসিগুলো যদি একদিনে অন্তত ৫টি করে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করে, তাহলে দিনে তারা ১০-১৫ লাখ অ্যান্টিবায়োটিক সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছে। যার মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক মানুষের হয়তো এটার প্রয়োজন ছিল।

একজন দোকানদারের পক্ষে কোন অ্যান্টিবায়োটিকটা রোগীর জন্য প্রয়োজন আর কোনটার প্রয়োজন নেই, তা বোঝার সুযোগ নেই। এমনকি অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পর্কে তাদের ধারণা না থাকায় তারা রোগীদের দুটি বা তিনটি অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে থাকে সাময়িক উপসমের জন্য, যা রোগীর জীবনকে বিপন্ন করে তোলে।

error20
fb-share-icon0
Tweet 10
fb-share-icon20


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
error: Content is protected !!