সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০, ১১:৩৩ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

সাংবাদিকতার জীবন্ত কিংবদন্তি পাবনার রণেশ মৈত্র

।। ফয়সাল মাহমুদ পল্লব।।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া রণেশ মৈত্র। সংবাদিকতা করেছেন দীর্ঘদিন। এখনো লিখছেন। সাংবাদিকতার জন্যে তাকে ২০১৮ সালে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

আজ ৪ অক্টোবর পাবনার কিংবদন্তি সাংবাদিক রণেশ মৈত্র’র ৮৭মত জন্মদিন। 

বর্তমান সময়ে ভাষাসংগ্রামীদের মধ্যে যারা জীবিত আছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রণেশ মৈত্র।

১৯৪৮ সালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়ে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দেয়ার মধ্য দিয়েই শুরু হয় তার রাজনৈতিক জীবন। একই সময়ে পত্রিকায় তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করায় তিনি সত্য সংবাদ প্রকাশ করার তাগিদে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে পড়েন।

রাজনৈতিক জীবনে বঙ্গবন্ধুর সাথে জেল খেটেছেন রণেশ মৈত্র। ষাটের দশকের শেষের দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন ঢাকা জেলে বন্দি তখন রাজশাহী জেল থেকে পরীক্ষা উপলক্ষে রণেশ মৈত্রকে ঢাকা জেলখানায় নেওয়া হয়।

বামপন্থী ছাত্রনেতা তখন রণেশ মৈত্র। শেখ মুজিব তখনও বঙ্গবন্ধু হননি। জেলখানার ভিতর প্রতিদিন সকালে বিকালে হাঁটতেন বঙ্গবন্ধু। তার হাঁটার সময় বন্দিরা দূরে দূরে থাকতেন অথবা তাদের দূরে দূরে রাখা হতো।

একদিন রণেশ মৈত্র সাহস করে তার দিকে এগিয়ে গেলে বঙ্গবন্ধু ভালোবেসে তাকে ডেকে নিয়ে হাঁটার সঙ্গী করে নেন। এরপর থেকে প্রতিদিন তাঁর সংগে হাঁটতেন রণেশ মৈত্র।

বঙ্গবন্ধুর সংগে হাঁটতে হাঁটতে তাদের মধ্যে অনেক আলাপ হতো। তরুন বামপন্থী ছাত্রনেতা রণেশ মৈত্র বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি নিয়ে অনেক অভিযোগ করতেন। বঙ্গবন্ধু তা শুনতেন আর হাসতেন।

একদিন বঙ্গবন্ধু রণেশ মৈত্রকে বলেন, আমার তো লক্ষ্য ভিন্ন! আমার লক্ষ্যতো বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বামপন্থী ছাত্রনেতা রণেশ মৈত্র বঙ্গবন্ধুকে মুখের ওপর বলেই ফেললেন, আপনাকে দিয়েতো আর যাই হোক স্বাধীনতা হবেনা।

কারন আপনার কেবলা তো আমেরিকা। আমেরিকা অন্তত আপনাকে স্বাধীনতা সংগ্রাম করতে দেবেনা। বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন, শোন রণেশ আমার বিভিন্ন উইং বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছে। তাজউদ্দিন সহ যারা স্বাধীনতার জন্য কাজ করছে তাদের কাজ ভিন্ন। অন্যরা কাজ করছে ভিন্ন উইং’এ।

এমন অনেক বিষয় নিয়ে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের অনেক কিছুর এনসাইক্লোপিডিয়া এই রনেশ মৈত্র। একজন জীবন্ত কিংবদন্তি।

একুশের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে রণেশ মৈত্র বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদের ওপর যে গুলি চলল ঢাকায়, তার খবরটা আমরা ইন্ডিয়ার রেডিওতে পাই। আমরা তখন শিখা সংঘের নেতারা বৈঠকে বসি।

সেখান থেকে সিদ্ধান্ত নেই এর প্রতিবাদে আমরা পরদিন পাবনায় হরতাল করব। ওইদিন রাতেই প্রশাসন থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হল, মোড়ে মোড়ে পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল।

আমরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে টিনের চোঙা দিয়ে এক মোড়ে হরতালের ঘোষণা দেই, আবার দৌড়ে আরেক মোড়ে গিয়ে ঘোষণা দেই। পুলিশের গুলিবর্ষণের ভয়কে উপেক্ষা করেই সেদিন রাজপথ কাঁপিয়েছিল ছাত্র-জনতা।

একুশে পদকপ্রাপ্ত এই প্রখ্যাত সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও রাজনীতিক রণেশ মৈত্র মহান ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন জনস্বার্থের আন্দোলনে সব সময় সাহসি ভুমিকা পালন করেছেন।

১৯৩৩ সালের ৪ঠা অক্টোবর তাঁর মাতামহের চাকুরীস্থল রাজশাহী জেলার ন’হাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আজীবন সংগ্রামী রণেশ মৈত্র।

বাবা রমেশ চন্দ্র ছিলেন পাবনার আতাইকুলা থানার ভুলবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। সপ্তম শ্রেণীতে উঠার পর থেকেই রণেশ মৈত্র টিউশনি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাতেন।

নিজ জীবন সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়েই রণেশ মৈত্র দেশের অসহায়, শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের জন্য আন্দোলন ও সংগ্রাম করেন। ১৯৫০ সালে পাবনা জিসিআই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন।

১৯৪৮ সালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়ে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দেয়ার মধ্য দিয়েই শুরু হয় তার রাজনৈতিক জীবন। ১৯৫৫ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৫৯ সালে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে তিনি পাবনা জেলার অন্যতম সংগঠক ছিলেন। সেই বছরেই তিনি ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সাংগঠনিক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশ অবজারভারের আব্দুল মতিন, কামাল লোহানীসহ প্রগতিশীল বন্ধুদের সাথে গঠন করেন শিখা সংঘ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন।

যে সংগঠনের একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার ছিল সেখান থেকে শিখা নামে একটি হাতে লেখা পত্রিকাও প্রকাশিত হত।

ভাষা আন্দোলন, ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনসহ পাক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য তিনি বহুবার কারা বরণ করেন।

১৯৫৫ সালে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৫৭ সালে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপে যোগ দেন। পরে ১৯৬৭’র দিকে তিনি মোজাফ্ফর আহমেদের নেতৃত্বাধীন রুশপন্থী ন্যাপে যোগদান করেন।

দীর্ঘদিন ন্যাপের প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাবনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের খান জেলার প্রগতিশীল বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে একটি সংগ্রাম কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটিরও রণেশ মৈত্র ছিলেন একজন অন্যতম সদস্য।

১৯৯৩ সালে তিনি ড. কামাল হোসেনের সাথে গণফোরামে যোগ দেন এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য হন। তিনি দীর্ঘদিন গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরে ২০১৩ সালে ঐক্য ন্যাপে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ঐক্য ন্যাপের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও পাবনা জেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

১৯৫১ সালে সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক নওবেলাল পত্রিকায় সাংবাদিকতার মাধ্যমেই তার সাংবাদিকতা জীবন জোরেসোরে শুরু হয়। এরপর কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সত্যযুগে তিন বছর সাংবাদিকতার পর ১৯৫৫ সালে তিনি যোগ দেন দৈনিক সংবাদে।

১৯৬১ সালে ডেইলি মর্নিং নিউজ এবং ১৯৬৭ সাল থেকে তিনি ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দৈনিক অবজারভারে পাবনা প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে দি নিউ নেশনের মফস্বল সম্পাদক হিসেবে যোগ দেয়ার পর ১৯৯৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি দি ডেইলি স্টারের পাবনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।

পরে তিনি স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়ে একজন ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে দেশের শীর্ষ পত্র পত্রিকায় কলাম লিখে সারাদেশে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছেন।

এ ছাড়া ১৯৬১ সালে পাবনায় পূর্ব পাকিস্তান মফস্বল সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত পুর্ব-পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই সম্মেলনের মাধ্যমে মফস্বল সাংবাদিকরা তাদের পেশার স্বীকৃতি পায়।

তিনি সেই বছরেই প্রতিষ্ঠিত পাবনা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ ছাড়া তিনি দীর্ঘদিন প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে জেলার সাংবাদিকদের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

সফল আইনজীবী হিসেবেও দীর্ঘদিন তিনি দায়িত্ব পালন করেন। পরে আইন পেশা থেকেও স্বেছায় অবসর নেন।

২০১৮ সালে তিনি সাংবাদিকতায় একুশে পদক লাভ করেন। তার স্ত্রী পূরবী মৈত্র বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পাবনা জেলা শাখার সভাপতি।

৪ ছেলে এবং মেয়েরা সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তার প্রকাশিত গ্রন্থ রূদ্র চৈতন্যে বিপন্ন বাংলাদেশ পাঠক মহলে সমাদৃত হয়েছে। এ ছাড়া তার প্রকাশিত স্মারক গ্রন্থ নিঃসঙ্গ পথিক তার জীবনের উপর বিভিন্ন জনের এক বর্ণিল চিত্রগাঁথা।

error20
fb-share-icon0
Tweet 10
fb-share-icon20


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
error: Content is protected !!