রবিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২২, ০৫:৪৫ অপরাহ্ন

সাংবাদিকতার সাড়ে তিন যুগ


।। এবাদত আলী।।
বারো
(পূর্ব প্রকাশের পর)
সুজানগর থানার দুলাই বাজারে যাত্রা দলের বায়না দিতে গিয়ে একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে হলো। পাশেই একটু দুরে পুলিশ এক ব্যক্তিকে লাঠি দিয়ে পিটাতে উদ্যত হতেই সে জোরে জোরে চিৎকার করে বলছে দেহেন স্যার আমারে মারবেননা। আপনার দোহাই লাগে আমাদের গায়ে হাত দিবেননা। আপনারে সাথে স্যার এরহমতো কথা ছিলেনা। আল্লার কিরে করে কচ্ছি স্যার আমরা কোন অন্যায় করিনি। আপনেরে সাথে ট্যাকা পয়সা লিয়েতো কোন টকঝক করিনি। যে টেকা দাবি করিছিলেন তার সবইতো দিছি। দরকার হরি আরো দেবো তাও গায়ে হাত দিবেননা পুলিশ বলছে দেখত পাচ্ছিসানা ব্যাটা সাংবাদিকরা এসে গেছে। খেলা পোঁদের মধ্যি যাবিনে। গেলি ব্যাটা বেয়াদপ কোথাকার। আমরা একটু দুর থেকে তা দেখতে পাই। ঘটনা আর কিছুই নয়। থানার পুলিশ ডিউটি করতে এসে যখন শুনেছে সাংবাদিকরা এসেছে তখন থেকে জুয়া খেলা চরকি খেলাসহ সব ধরণের জুয়া খেলা বন্ধ করতে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে।

পুলিশের তৎপরতায় সে রাতে যাত্রা প্যান্ডেলের আশেপাশে কোথাও জুয়া কিংবা চরকি খেলা অনুষ্ঠিত হয়নি। পুলিশ বলেছে সাংবাদিকরা চলে গেলে খেলা হবে।
কিন্তু সেই রাতে আমরা আটঘরিয়া প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা নায়ক পার্টি হিসেবে সারারাত জেগে যাত্রানুষ্ঠান দেখলাম। কিন্তু পালা বেশি ভালো হলোনা। অর্থাৎ এই যাত্রা পার্টি নিয়ে গেলে প্রেসক্লাবের কোন উন্নয়ন হবেনা। বাধ্য হয়ে আমাদেরকে ফিরে আসতে হলো।

এর দুদিন পরই প্রেসক্লাবের যাত্রা পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি ছাদেক বিশ্বাস খবর দিলেন নাটোরের দোয়াতপাড়ায় একটি যাত্রাদল রয়েছে যাদের পালা খুব উন্নতমানের । সেখানে যেতে হবে। কি আর করা আমরা কজনা দোয়াতপাড়া গেলাম। পাবনা রাজশাহী মহাসড়কের পাশেই দোয়াতপাড়া স্কুল। এইস্কুল মাঠেই আয়োজন করা হয়েছে যাত্রাপালার। সাংবাদিক পরিচয়ে দুলাই গিয়ে যে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলাম এবার আর তা হলোনা। অর্থাৎ সাংবাদিকের পরিচয় এখানে গোপন রাখা হলো। যাত্রা মানেই জুয়াখেলার আসর, চরকিসহ অন্যান্য খেলার মাধ্যমেও জুয়া চলে অবাধে। জুয়া বন্ধের ব্যাপারে কারো কোন মাথাব্যথা নেই। আর যাত্রা অনুষ্ঠানের আশেপাশে জুয়ার আসর না থাকলে নাকি যাত্রা পরিচালনাকারিদের নাকি কোন লাভ হয়না।

নায়কপার্টি হিসেবে আমাদেরকে যথেষ্ট সমাদর করা হলো। যাত্রানুষ্ঠান শুরুর আগে যাত্রাদলের লাইন ম্যনেজার আমাদেরকে স্পেশাল সিটে বসার ব্যবস্থা করে দিলেন। রাত প্রায় সাড়ে বারোটায় যাত্রাপালা শুরু হলো। শুরুর আগে দীর্ঘক্ষণ ধরে কনসার্ট বাজানো হলো। এমনভাবে বাদ্যযন্ত্র বাজানো হলো তাতে মনে হলো এখনই বুঝি যাত্রাপালা শুরু হয়ে গেল। এই বাদ্য বাজানোর ফলে দর্শকগণ অতি তাড়াহড়ো করে যাত্রা মঞ্চে প্রবেশ করে ।

একসময় সুচনা সঙ্গীত শুরু করা হলো। যাত্রাদলের সকল নারী শিল্পীকেই এই সুচনা সঙ্গীতে অংশ নিতে হয়। এটাই হলো নারী শিল্পীদের প্রাথমিক পরিচিতি। সঙ্গে জনাকয়েক ছোকরা। সকলের মুখেই কড়া পেইন্টের প্রলেপ। পরনে জরির পোষাক। হ্যাজাক ও ডে-লাইটের আলোতে প্রত্যেকের চেহারাই খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। তাদের অমন রূপ দর্শনে কমবেশি সকল দর্শক-শ্রোতাই মুগ্ধ বলতে হয়। সুচনা সঙ্গীতে তারা বাদ্যের তালে তালে গাইলো ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে বাংলার আকাশে ….. আনলে যারা তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবেনা। না না না কোন দিন শোধ হবেনা।’ এই গানটি শেষ করে উপস্থিত দর্শক শ্রোতাদেরকে অভিবাদন জানাতে জানাতে তারা সাজঘরে ফিরে গেল। এসময় কিছু যুবক দর্শক ঠোঁটে শিষ বাজিয়ে তাদেরকে উৎসাহিত করলো। এরপর শুরু হলো যাত্রাপালা। ব্রজেন্দ্রনাথ দাস রচিত যাত্রাপালা ‘‘বাঙ্গালী”। যাত্রাগানের পালা যাই হোকনা কেন বলতে গেলে পুরো সময় জুড়েই চল্লো নাচ। এমনিভাবে চলতে চলতে রাত কাবার হয়ে গেল। দলটি আমাদের সকলেরই পছন্দ হলো। যৎকিঞ্চিত বায়না করে আমরা ফিরে এলাম।

এবার প্রস্তুতির পালা। যাত্রাপালা আনতে গিয়ে প্রথমেই ডিসি সাহেবের পারমিশন প্রয়োজন হলো। এতে আমাদের কোন বেগ পেতে হলোনা। প্রেসক্লাবের উন্নয়নের জন্য আটঘরিয়ার সাংবাদিকগণ যাত্রাপালার আয়োজন করবে তাতে কর্তৃপক্ষের কোন আপত্তি থাকার কথা নয়। দরখাস্ত দেওয়ার পর ডিসি অফিস থেকে পাঠানো হলো সিও (ডেভ ) অফিসে। সিও ডেভ থানার মতামতের জন্য ওসির কাছে পাঠালেন। ওসি ও সিও (ডেভ) এর মতামতের ভিত্তিতে ডিসি অফিস থেকে পারমিশন পাওয়া গেল। তবে যাত্রাপালা চালাতে গেলে সরকারকে এমাউজমেন্ট ট্যাক্স দিতে হবে। আর এই ট্যাক্স প্রতিদিন সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে টিকিট বইতে সিল দিয়ে নিতে হবে। যাত্রা পরিচালনার জন্য দেবোত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দেবোত্তর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ এবং সে সাথে বালিকা বিদ্যালয়ের দুএকটা কামরা ব্যবহারের ও অনুমতি পাওয়া গেল স্কুল কমিটির বদন্যতায়। স্থানীয়ভাবে টিনের জোগাড় হলো। মাগনা বাঁশও পাওয়া গেল বেশ কিছু। যা দিয়ে গোটা বিদ্যালয় মাঠের ঘেরার কাজ সমাধা হলো। আর এসব কাজ হলো স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে। এইসকল কর্মীদের জন্য যাত্রা চলাকালিন সময়ে দু একটা ‘পাশ’ এর ব্যবস্থা করে দিলেই তারা খুশি।

আটঘরিয়া প্রেসক্লাবের সাংবাদিকেরা যাত্রাপালার আয়োজন করবে তা এলাকার সুধিজনের মধ্যে অনেকেই বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। এব্যাপারে দুএকজনের কাছ থেকে বিরূপ মন্তব্যও শোনা গেছে। আবার অনেকেই আমাদেরকে বেশ বাহবা দিয়েছেন। (ক্রমশঃ)। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।


© All rights reserved 2022 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com