রবিবার, ৩১ মে ২০২০, ০৫:৪২ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

সেই সিরাজের যত কীর্তি

সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার বহুনিন্দিত অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার কুকীর্তিগুলো দিন দিন উন্মোচিত হতে চলেছে। স্থানীয়রা বলছেন, নুসরাত হত্যার পরিকল্পক সিরাজ হলেন ‘নির্ভেজাল ভালো মানুষ’ সেজে জঘন্য মতলব হাসিল করে নেওয়ার বেলায় ওস্তাদ। গতকাল সিরাজের ‘রক্ষক’ নামে এলাকায় পরিচিত রুহুল আমিনকে পিআইবি আটক করেছে। আর আটক অধ্যক্ষের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এদিকে, মাদ্রাসাটির পরিচালনা কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পি কে এম এনামুল করিম জানান, মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যায় কমিটির একাধিক সদস্য জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় কমিটি গত বৃহস্পতিবার ভেঙে দেওয়া হয়। নুসরাতকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় ৬ এপ্রিল। পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায় সে। সোনাগাজীর স্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট ফেরদৌস আলম জানান, ‘সিরাজ-উদ-দৌলা নৈতিক চরিত্রহীন একজন ব্যক্তি। তিনি যে মাদ্রাসায় কাজ করেছেন সেখানেই বিভিন্ন ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক কাজে জড়িয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক দুর্নীতি, মাদ্রাসা ফান্ডের টাকা আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের একটি চেকের মামলা বর্তমানেও চলমান আছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আরও ৬টি মামলার অভিযোগ আমরা পেয়েছি। তিনি বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। মাদ্রাসা ফান্ডের অনেক টাকা তিনি আত্মসাৎ করেছেন। ফাজিলপুরের একটি ফাজিল মাদ্রাসায় থাকার সময় তিনি সেই মাদ্রাসার সুনাম-মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছন এবং মাদ্রাসাটির ইমেজের ওপর বিভিন্নভাবে আঘাত করেছেন। তিনি দুর্নীতির টাকা দিয়ে ফেরদৌসি ম্যানশন নামে একটি আলিশান বাসা শহরের পাঠানবাড়ী এলাকায় তৈরি করেছেন।’ সিরাজের বাড়ি সোনাগাজীর আমিরাবাদ ইউনিয়নে। ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহিরুল আলম জহির বলেন, ‘সিরাজের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদে অর্থ আত্মসাতের তিনটি লিখিত অভিযোগ জমা আছে। তিনি ফেনীতে একটি বহুমুখী সমবায় সমিতি খোলেন এবং এই ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ থেকে দু-তিন লাখ টাকা করে নিয়ে তাদের সমিতির সদস্য করেন। কথা দেন, ইসলামী শরিয়াভিত্তিক নিয়মে লভ্যাংশ দেওয়া হবে। লভ্যাংশ দূরের কথা, সমিতির এই সদস্যদের সঙ্গে তিন বছর ধরে সিরাজ কোনো যোগাযোগই রাখেননি। তখন গ্রাহকরা মূল টাকার জন্য চাপ দিতে থাকেন। কাজ না হওয়ায় তারা আমার কাছে ধরনা দেন। সিরাজ আমার এলাকার আমির উদ্দিন মুন্সিরহাট মসজিদের খতিব ছিলেন। শুক্রবার ইমামতি করতে আসতেন। আমি অনেক কষ্টে সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে এক ব্যক্তির টাকা আদায় করে দিতে পেরেছি। আমার জানা মতে সিরাজ আড়াই শ-তিন শ ব্যক্তির কাছ থেকে আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ টাকা করে নিয়েছেন। কাউকেই টাকা ফেরত দেননি। এর আগে তিনি লালপুল মাদ্রাসায় ছিলেন। ওখানে থাকতে এক বালকের সঙ্গে বলাৎকারের ঘটনা ঘটান।’ চেয়ারম্যান জহির বলেন, ‘এ রকম একজন ধর্ষক-খুনি-লম্পটের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।’ জানা যায়, অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর তার কামরায় নাসরিন সুলতানা ফুর্তি নামে এক মাদ্রাসাছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। ছাত্রীটি কামরা থেকে বেরিয়ে এসে বাড়ি গিয়ে বাবা-মাকে বিষয়টি জানায়। ওর বাবা সিরাজুল ইসলাম ঘটনাটি মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য জামশেদকে জানান। জামশেদ বিচারের আশ্বাস দেন বটে, বিচার আর করা হয়নি। এভাবে একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে পার পেয়ে যাওয়ায় অধ্যক্ষ সিরাজ বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ‘আওয়ামী লীগ নেতারা আমার সঙ্গে আছেন’ এ রকম আস্ফালন করে তিনি নানা কায়দায় তার কুকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ মামুন ২০১৭ সালে জেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেন, অধ্যক্ষ সিরাজ মাদ্রাসার তহবিলের ৩৯ লাখ টাকা মেরে দিয়েছেন। বিপদে পড়েন সিরাজ। স্থানীয়রা জানান, ওই সময় তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি (এবং বিলুপ্ত মাদ্রাসা কমিটির সহসভাপতি) রুহুল আমিন। রুহুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ভুয়া ভাউচার বানিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগটি ধামাচাপা দিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, ‘উম্মুল কোরআন’ নামে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করবেন বলে প্রচার করে সিরাজ তিন কোটি টাকা মেরে দিয়েছেন বিভিন্ন প্রবাসী ও ধনাঢ্য ব্যক্তির। মাদ্রাসা স্থাপন না করায় দাতারা টাকা ফেরত চাইতে শুরু করেন। সিরাজ টাকা ফেরত দেন না। অগত্যা আবদুল কাইয়ুম নামে এক ব্যক্তি ২০১৭ সালের ২৮ আগস্ট আদালতে মামলা ঠুকে দেন। তিনি অভিযোগ করেন, সিরাজের কাছে দাতাদের পাওনা ১ কোটি ৩৯ লাখ ৪ হাজার ৫০৬ টাকা। এ মামলা এখনো ফেনীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন। শাহবাগে নাগরিক অবস্থান : বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জানান, ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকান্ডে জড়িত সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনসহ সব অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। গতকাল বিকালে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীজোট’ ও ‘সমাজের জাগ্রত নাগরিকগোষ্ঠী’র ব্যানারে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, নারী উদ্যোক্তা আইরিন রাব্বানী প্রমুখ।

রুহুল আমিন আটক : নুসরাত হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিনকে পিবিআই শুক্রবার আটক করেছে। তিনি সদ্যবিলুপ্ত মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। নুসরাত হত্যা মামলায় গ্রেফতার ব্যক্তিরা ১৬৪ ধারায় দেওয়া তাদের জবানবন্দিতে হত্যাকাে রুহুল আমিনের জড়িত থাকার কথা জানান।

পপির স্বীকারোক্তি ও জাবেদ রিমান্ডে : মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় অধ্যক্ষের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। গতকাল ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শরাফ উদ্দিন আহম্মেদের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এছাড়া এজাহারভুক্ত আসামি জাবেদ হোসেনের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে একই আদালত।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল এসপি মো. ইকবাল গণমাধ্যমকে জানান, উম্মে সুলতানা পপি আদালতে স্বীকার করেছে, সে ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। পপি ঘটনার দিন নুসরাতকে ছাদে ডেকে নেয় এবং কিলিং মিশনে অংশ নেয়। এর আগে এ মামলায় চারজন আসামি নুসরাত হত্যার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিল। তারা হলো মামলার এজাহারভুক্ত আসামি নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, আবদুর রহিম শরীফ ও হাফেজ আবদুল কাদের।

error20
fb-share-icon0
Tweet 10
fb-share-icon20


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
error: Content is protected !!