বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২০, ০৮:৫১ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

স্মৃতির পাতা থেকে- সিরিজ বোমা হামলায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া

 

।। এবাদত আলী।।

আমি তখন ঢাকা বিভাগে জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ি উপজেলা ভুমি অফিসে কানুনগো পদে চাকুরি করতাম। দীর্ঘ আড়াই বছর পর ভাগ্যগুনে নিজ বিভাগ রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে যোগদান করার সুযোগ লাভ করি।

নিজ জেলা পাবনার রাজস্ব প্রশাসনে চাকুরি করার সুযোগ পাবো আশায় রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার অফিসে গিয়ে আমার যোগদানপত্র দাখিল করি।

দিনটি ছিলো ২০০৫ সালের ১৭ আগষ্ট। এদিন সকালে আমি বাস যোগে রাজশাহী গিয়ে বিভাগীয় কমিশনার অফিসে যোগদানপত্র দাখিল করতে গেলে প্রধান সহকারি বদরুদ্দেজা বলেন যোগদান পত্রের আরো কয়েক কপি ফটো কপি লাগবে। সম্পুর্ণ অপরিচিত জায়গা। কোথায় ফটো কপি করতে হবে তা জানা নেই।

তিনি আমার ভাবান্তর লক্ষ্য করে বল্লেন যে মেইন রোডে উঠে সোজা পশ্চিম দিক দিয়ে গেলে কোর্ট এলাকা। সেখানে সহজেই ফটো কপি করা যাবে। বিভাগীয় কমিশনার অফিস থেকে বেরিয়ে পায়ে হেঁটে কোর্ট চত্বরের উত্তর পাশে একটি দোকানে গিয়ে কিছু সময় অপেক্ষা করার পর আমার কাগজ গুলো ফটো কপি করার জন্য মেশিনম্যানের হাতে দিলাম।

সামান্য সময়ের ব্যবধানে কাজ শেষ হলে কাগজ গুলো হ্যান্ড ব্যাগে ভরে ওর পয়সা চুকিয়ে দিয়ে কেবল সামনের দিকে পা বাড়িয়েছি। আর তখুনি বোমা ফাটার শব্দ। মূহুর্মুহ বোমা বিস্ফোরনের শব্দ আর ধুঁয়ায় চোখে কিছুই দেখতে পারছিলামনা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় তৎক্ষনাত মাটিতে শুয়ে পড়লাম।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার সুবাদে প্রশিক্ষণের একটি অংশ কাজে লাগালাম। দু কনুইএর ওপর ভর করে দুকানে আঙ্গুল প্রবেশ করিয়ে ক্রোলিং করতে করতে সামনে এগুতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু যাবো কোথায়। ধুঁয়ায় চারদিকে অন্ধকার। তার সাথে বারুদের গন্ধে নাক-মুখ বন্ধ হয়ে আসছে। নিঃশ্বাস নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে।

এরই মাঝে লক্ষ্য করলাম আমার শার্টের হাতা তাজা রক্তে ভিজে গেছে। আমি ভাবলাম আমার শরীরের কোথাও ইনজুরি হয়েছে এবং সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। কিন্তু না আমার পাশে এক মধ্যবয়সি ব্যক্তির সারা শরীর রক্তে ভিজে গেছে। তিনি আমার কাছে সাহায্য চাইছেন। পানি পানি করে চিৎকার করছেন।

কিন্তু তখন তাকে আমি কি সাহায্য করবো। পানি কোথায় পাবো। আমি নিজেই তখন পিপাসায় কাতর। আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত। আমি সে লোকটার সাহায্যের জন্য কিছুই করতে পারলামনা। সে বেঁচে আছে কি মারা গেছে তাও দেখার মত সময় আমার কাছে নেই। নিজের জীবনই যখন বিপন্ন তখন অন্যের কথা ভাবি কি করে।

পাশে আরো কয়েকজন ছটফট করছে। কাতরাচ্ছে। আমি শরীরের সকল শক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সামনে এগুতে চেষ্টা করলাম। সেই সাথে হাতের ব্যাগটি রক্ষা করার জন্যওখেয়াল করছি বার বার। পায়ের এক পাটি স্যান্ডেল আছে আরেক পাটি নেই। আমার বুদ্ধি বল তখন যেন সব হারিয়ে গেছে। এরই মাঝে আরেক ঝামেলা এসে হাজির হলো।

টলতে টলতে সামান্য দুর এগুতেই এক পুলিশ আমাকে ঝাপটে ধরলো। সেই সাথে আরো তিন চার জনকে। পাশের এক কনেস্টবল জোরে শোরে বল্লো ধর শালাদের, শালারা পালাচ্ছে। আমি বল্লাম আমি বিভাগীয় কমিশনার অফিসে চাকুরি করি। একজন বল্লো কিসের বিভাগের চাকরি। আমি সঙ্গে সঙ্গে জোর গলায় বল্লাম আমি ডিসি অফিসের ষ্টাফ।

কি যাতা বলছেন। ডিসি অফিসের কথা বলায় এবার বেচারা যেন একটু নরম হলো। বল্লো আপনি এদিকে আসেন। পথ দেখিয়ে বল্লো সোজা এদিক দিয়ে চলে যান। জলদি করেন। আমি দ্রুত পায়ে উল্টো দিকে চলে গেলাম। খানিক দুরে একটি চায়ের দোকানে গিয়ে জামার রক্ত কোন মতে ধুয়ে ফেল্লাম।

পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে একটি রিকসা যোগে কমিশনার অফিসে গিয়ে আমার যোগদানপত্র জমা দিয়ে সাহেব বাজারের মুন হোটেলে গিয়ে উঠলাম।

হোটেল ম্যানেজার শুনিলদা আমার পুর্ব পরিচিত। তাঁর শশুর বাড়ি চাটমোহর এলাকায়। তিনি একজন হোটেল বয়কে ডেকে আমার শার্ট -প্যান্ট লন্ড্রিতে পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন। সেই সাথে এক জোড়া স্পঞ্জ আনিয়ে দিলেন। তিনি আমাকে টিভি রুমে নিয়ে গেলেন।

তখুনি জানতে পারলাম সারা বাংলাদেশের ৬৩ টি জেলায় এক যোগে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ ( জে এম বি) বাংলাদেশের ৬৩ জেলার ৪শ স্থানে একযোগে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। আলোড়ন সৃষ্টিকারি এ হামলার মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে কার্যক্রম শুরু করেছিল জে এম বি।

আত্মঘাতি বোমা হামলায় এদিন নিহত হন বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাসহ ৩৩জন।

আহত হন ৪ শতাধিক নারী-পুরুষ। পরে জানা গিয়েছিলো সিরিজ বোম হামলার মুল পরিকল্পনাকারি হিসেবে জেএমবি প্রধান শায়খ আব্দুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইএর প্রধান ভুমিকা ছিলো।

বলতে গেলে সারা দিনই টিভি সেটের সামনে। এরই মাঝে মোবাইল ফেনের মাধ্যমে বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমি সম্পুর্ণ ভালো আছি জেনে তারা আশ্বস্ত।

বিভাগীয় কমিশনার অফিসে যোগদান করার পর যতদিন আমার পোষ্টিং অর্ডার না হবে ততদিন আমাকে এই হোটেলেই থাকতে হবে। চারদিকের অবস্থা এতটাই খারাপ যে রাস্তায় বের হবার জো নেই।

আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী এতটাই বেপরোয়া ভুমিকা পালন করছে যে, যেকোন সময় যে কাউকে এ্যারেষ্ট করে থানায় নিয়ে যাচ্ছে। তাদের কাছে ‘আঁধার ঘরে সাপ তো সকল ঘরেই সাপ’ এমনি অবস্থা বিরাজমান।

শুধু কি তাই? রাতের বেলা রাজশাহী শহরের সবকটা হোটেল-মোটেল এ রেড দেয়া হয়। হোটেলের প্রতিটি কক্ষেই তল্লাশি চালানো হয়। অনেক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

পোষ্টিং অর্ডার না হওয়া পর্যন্ত যে কদিন আমাকে রাজশাহীতে অবস্থান করতে হয়েছিলো বলতে গেলে সে কদিনই পুলিশের কাছে বার বার নিজের পরিচয় তুলে ধরতে হয়েছিলো। অবশেষে ২৭ আগষ্ট তারিখে পাবনা জেলার বনোয়ারিনগর ফরিদপুর উপজেলা ভুমি অফিসে আমার পোষ্টিং অর্ডার হলে বলতে গেলে সিরিজ বোমা হামলার অহেতুক ঝামেলা থেকে আমি মুক্তি লাভ করি ।

(লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।

 

 

error20
fb-share-icon0
Tweet 10
fb-share-icon20


পাবনার কৃতি সন্তান নাসা বিজ্ঞানী মাহমুদা সুলতানা

পাবনার কৃতি সন্তান নাসা বিজ্ঞানী মাহমুদা সুলতানা

পাবনার কৃতি সন্তান নাসা বিজ্ঞানী মাহমুদা সুলতানা

Posted by News Pabna on Monday, August 10, 2020

© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
error: Content is protected !!