বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০৫:৪৪ পূর্বাহ্ন

হাড়লপাড়ার হুজুর হজরত শাহ সুফি মওলানা এ এম এম কবির উদ্দিন (র.)

হাড়লপাড়ার হুজুর হজরত শাহ সুফি মওলানা এ এম এম কবির উদ্দিন (র.)

।। এবাদত আলী ।। পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার মাজপাড়া ইউনিয়নের হাড়লপাড়া গ্রামের হুজুরের মোড় নামে খ্যাত স্থানে যাঁর মাজার শরীফ অবস্থিত, তিনি হজরত শাহ সুফি মওলানা এ এম এম কবির উদ্দিন (র.) ।

যিনি সকলের নিকট হাড়লপাড়ার হুজুর নামেই পরিচিত।

হজরত মওলানা এ এম এম কবির উদ্দিন (র.) গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার নাকাসিনি গ্রামে ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম শহর আলী ব্যাপারি, মাতার নাম মরহুমা মকবুলেন নেছা। মওলানা কবির উদ্দিনেরা চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে ছিলেন সর্ব কনিষ্ঠ। তিনি ছোটবেলায়ই তাঁর বাবা ও পরিবারের অন্যান্যদের সাথে পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার মাজপাড়া ইউনিয়নের হাড়লপাড়া গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

শিক্ষা জীবনে তিনি মাজপাড়া সিনিয়র মাদরাসা থেকে দাখিল পাশ করেন। এরপর শিবপুর মাদরাসায় ভর্তি হন পরবর্তীকালে সেখান থেকে বগুড়ার একটি মাদরাসায় ভর্তি হয়ে আলিম পাশ করেন। এরপর তিনি দাশুড়িয়া এমএম হাই স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯৬৩ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। কর্ম জীবনের শুরুতে তিনি আটঘরিয়ার রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তারপর তার চাকরির শেষ কর্মস্থল ছিলো খিদিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

এখান থেকে তিনি অবসর গ্রহন করেন। তিনি ফুরফুরা শরীফের পীর আলহাজ হজরত মওলানা আবু বকর সিদ্দিকীর বড় ছাহেবজাদা হজরত মওলানা আব্দুল হাই পীর ছাহেবের নিকট মুরিদ হন।

স্বপ্নের মাঝে পীর সাহেবের নিকট বয়াত গ্রহনের পর তিনি আপন পীরকে খুঁজতে থাকেন। এক সময় ঈশ্বরদীর পাকশী খানকা শরীফে গিয়ে পীরের দেখা পান। পীর ছাহেব তাকে তাওয়াজ্জোহ দান করেন। তরিকা গ্রহনের পর পরই তিনি হাড়লপাড়া জামে মসজিদে প্রতি মাসে জেকের মাহফিলের ব্যবস্থা করেন। যা আজো চালু রয়েছে।

তিনি এলাকায় সালাত কমিটি গঠন করেন। তাতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। তিনি নিজ বাড়ি হাড়লপাড়ায় একটি খানকা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে প্রতি বছর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

তিনি গ্রামের লোকের চলাচলের সুবিধার জন্য নিজ উদ্যোগি হয়ে গ্রামের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে হাড়লপাড়া হতে খিদিরপুর বাজার পর্যন্ত একটি রাস্তা নির্মাণ করেন। পার্শ্ববর্তী চন্দ্রাবতি নদীতে বাঁশের শাকো নির্মাণ করে জনসাধারণের চলাচলের ব্যবস্থা করে দেন।

তিনি ছিলেন পর উপকারি। তাঁর নিকট ছোট বড়র কোন ভেদাভেদ ছিলোনা। তিনি সকলকেই সমান ভাবে ভালো বাসতেন। তাঁর আমল, আখলাক, কোমল ব্যবহারে অনেক পথ হারা মানুষ আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের পথে অগ্রসরহতেন। এখনো তাঁর রূহানি দোয়া ও ফয়েজে মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতের মুক্তির পথ নির্দেশনা লাভ করে থাকেন। তিনি ছিলেন বিখ্যাত বুজুর্গ ও ফুরফুরা ছিলছিলার পীর। তিনি অগনিত মানুষকে মুরিদ করেন এবং তাওয়াজ্জোহ প্রদান করতেন।

মওলানা কবির উদ্দিন সকলের নিকট হাড়লপাড়ার হুজুর নামেই বিশেষ পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৯৬০ সালে আটঘরিয়া উপজেলার মিয়াপাড়া গ্রামের মরহুম খাদেমুল ইসলাম মাষ্টারের কন্যা মোছাম্মাৎ জোবেদা খাতুনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি পাঁচ ছেলে ও ছয় মেয়ের জনক। বড় ছেলে মোঃ আখতারুজ্জামান বাদশা পারখিদিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক ও হুজুরের খানকা শরীফ, হেফজ খানা ও জিকির মাহফিলের দায়িত্বপ্রাপ্ত।

হাড়লপাড়ার হুজুর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য আমার সুহৃদ সৈয়দ সাইফুলসহ ২০১৪ সালের ১০ মার্চ পারখিদিরপুর আলহাজ আকতারুজ্জামানের পারখিদিরপুরের বাসায় পৌঁছলে এই সকল তথ্য পাওয়া যায়।

হাড়লপাড়ার হুজুর এম এম কবির উদ্দিন ১৯৯৮ সালে অসুস্থ হন। তিনি অগনিত ভক্ত ও মুরিদকে কাঁদিয়ে ২০০৪ সালের ২৭ জুলাই সোমবার দিনগত রাত তিনটায় ইন্তেকাল করেন। পরদিন খিদিরপুর হাইস্কুল মাঠে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা নামাজে ২০/২২ হাজার মুসুল্লি শরীক হন বলে তাঁর বড় ছেলে আকতারুজ্জামান বাদশা জানান।।

সেখানে বক্তব্য দেন আকতারুজ্জামান বাদশা। জানাজা নামাজের ইমামতি করেন তাঁর সেজ ছেলে মওলানা মনিরুজ্জামান মুকুল । পরে তাঁকে নিজ বাড়িতে দাফন করা হয়। হাড়লপাড়া খানকা শরীফের পাশেই তাঁর মাজার অবস্থিত। প্রতি বছর ২৭ জুলাই তারিখে তাঁর মাজার প্রাঙ্গনে বার্র্ষিক জালছা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া প্রতি চন্দ্র মাসের ১১ তারিখে মাজার প্রাঙ্গনের খানকায় মাসিক জেকের মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

হাড়লপাড়া হুজুরের অনুসারিরা বিভিন্ন স্থানে খানকা প্রতিষ্ঠা করে সেখানে পর্যায়ক্রমে প্রতি মাসে জিকির আজগার করে থাকেন বলে জানা যায়।

হাড়লপাড়ার হুজুর মওলানা এমএম কবির উদ্দিন (র) সম্পর্কে বিভিন্ন কারামতির কথা এলাকায় জনশ্রুতি হয়ে আছে। মোঃ শফিউল্লাহ সম্পাদিত আলোর পথে-৩ নামক একটি পুস্তিকার ৫ম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত আটঘরিয়ার হাপানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মোঃ শাহজাহান আলী লিখেছেন“ ১৯৮৫ ইংরাজি সাল। ফালগুন মাস, ১৬ তারিখ। রবিবার দিন চলে গেল, সন্ধ্যা হলো। মসজিদে মসজিদে আজান হচ্ছে। আজান শেষ হয়ে গেলো। আমি তাড়াতাড়ি ওজু করে আমার বাড়িতে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে মাগরিবের সালাত আদায় করলাম। তারপর চক্ষু দুটি বন্ধ করে নফি এজবাতের লাইলাহা- ইল্লাল্লাহ জিকিরে রতআছি। হঠাৎ বাহির থেকে জোরে শব্দ আসলো, আপনি বাহিরে আসুন।

আমি প্রথম ডাকে সাড়া দিলামনা, দ্বিতীয়বার আরো জোরে শব্দ আমার কানে লাগলো যে, মনে হলো আমার কানের তালা ফেটে গেলো। আমি তাড়াতাড়ি বাইরে এলাম। এসে চোখ বুলাতেই দেখি আমার প্রাণপ্রিয় হুজুর শাহ সুফি আল্লামা হজরত মৌলানা মোঃ কবির উদ্দিন সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি তার উত্তর দিলেন এবং আমাকে বললেন, দেরি না করে জুব্বা পরে ও হাজি রুমালটা নিয়ে বেরিয়ে আসুন, অনেক দুরে যেতে হবে। আমি বাড়ির বাইরে গিয়ে কাউকে কিছু না বলে তিনার পিছু পিছু রওয়ানা হলাম।

তিনি বললেন ডানে বামে কিছু খেয়াল করবেন না। আমি যেদিকে যাবো সেইদিকে চলে আসুন। এভাবে যেতে যেতে হঠাৎ তিনি থামলেন। তখন আমি চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম, আমি পাবনা আরিফপুর কবরস্থানে ।

সেখানে তিনি আমাকে সঙ্গে করে দোয়া করলেন। আবার যাএা শুরু হল। এমন সময়ে আকাশে হালকা মেঘ হল এবং কিছু ঠান্ডা বৃষ্টি হল। আমার হুজুর কেবলা আমাকে ধরে একটি বটগাছের নিচে বসে পড়লেন। তার পর আমাকে বল্লেন নিচের দিকে তাকান। আমি নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একটি ছোট্ট গর্ত। আর তার মধ্য থেকে সাদা পোশাক পরা একটি মানুষ আমাদের দিকে আসছে। ইহার পর খুব অন্ধকার হয়ে গেলো আর আমি কিছুই দেখতে পারলামনা। অল্পক্ষণ পর আমি দেখতে পেলাম একটি সুন্দর আলোকিত স্থান। হুজুর বল্লেন, আপনি ভালো করে দেখুন এখানে কি আছে। আমি ভয়ে থর থর করে কাঁপছি এবং ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় কথা বলছি। “ হুজুর আমি কখনো এমন স্থান দেখিনি। হুজুর বল্লেন, এই

স্থানটির নাম মদিনা শরীফ, রাছুল পাক (সা.) এর রওজা মোবারক। তারপর তিনি আমাকে সঙ্গে করে রওজার পাশে দাঁড়ালেন। অনেক দোয়া করার পর দেখলাম রওজা হতে হুজুর পাক (সা.) সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তারপর একটি গোলাপ ফুলের মালা হয়ে হজরত মওলানা মোঃ কবির উদ্দিন সাহেবের বুক হুজুরের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে গেলো। তখন আমি গোনাহগার হুজুরের পিঠের সঙ্গে আটকে ছিলাম।”। (তথ্য সুত্র : মোঃ শফিউল্লাহ) সম্পাদিত আলোর পথে-৩ নামক একটি পুস্তিকার ৫ম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!