শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ০৫:০০ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

হিটলারের পতন; একটি নতুন তথ্য

Adolf Hitler

image_pdfimage_print

।। ডা. শামীম হুসাইন ।।  একক শব্দ কেন- একাধিক বাক্যেও সহসা এক নায়ক হিটলারের পতন ব্যাখ্যা করা যায় না। ধর্ম এবং নীতি নৈতিকতায় বিশ্বাসীরা এক বাক্যে বলবেন, তার পাপ আকাশচুন্বী হয়ে খোদার আরশটাকে পর্যন্ত ছুঁয়ে যাবার স্পর্ধা দেখাচ্ছিল। অতএব নেমে এসেছিল স্রষ্টার অভিশাপ। বিচারের ন্যায়দণ্ডে তছনছ হয়ে গিয়েছিল হিটলারের বিশ্ব বিজয়ী হবার স্বপ্ন।

সমর বিশারদদের অভিমত কিন্তু ভিন্ন। অস্ত্রসন্ত্রে হিটলারের দৈন্যতা কতটুকু ছিল সে বিতর্কে না গিয়েও তারা বলেছেন রণকৌশলগত কিছু ক্রটি তার পতন ত্বরান্তিত করে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে প্রচণ্ড শীতের মৌসুমে সোভিয়েত রাশিয়ায় আগ্রাসন পরিচালনার সিদ্ধান্ত।

কিন্তু হিটলার কি এই আক্রমনের পরিনতি সম্বন্ধে অজ্ঞ ছিলেন? প্রশ্নটার উত্তর ইতিবাচক। আর এটা ছিল তার স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসাগত ক্রটির সংগে সংশ্লিষ্ট। নতুন এই তথ্যটি দিয়েছেন রিনেট এবং এল হেসটোন।

সম্প্রতি প্রকাশিত THE MEDICAL CASE BOOK OF ADLOF HITLER নামের একখানা বইয়ে তারা গর্বোদ্ধত এই এক নায়কের করুন পরিনতির কারণ হিসেবে তার স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত ভুল ক্রটির বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।

তারা দেখিয়েছেন কিছু কিছু ঔষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিটলারকে প্রায় পঙ্গু করে ফেলেছিল। বিশেষত: সঠিক কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তার অপারগতা ছিল প্রায় আকাশচুন্বী। প্রচণ্ড শীতের মধ্যে শোভিয়েত রাশিয়া আক্রমনের পরিকল্পনা এ কারণটির সংগেই সংশ্লিষ্ট।

রিনেট এবং এল হেসটোন বিভিন্ন প্রমান উপস্থাপিত করে দেখিয়েছেন স্বৈরাচারী হিটলারের পতন ঘটাতে এমফিটামিন নামে পরিচিত একটি ঔষুধের ভূমিকা নিছক কম ছিল না।

এই ঔষুধের প্রতি দুর্দমনীয় আসক্তি তাকে এমন একটা অবস্থানে পৌছে দেয় যেখানে অবস্থান করে জটিল কোন সমস্যার সহজ সমাধান খুঁজে পাওয়া তার জন্য সম্পূর্ন অসম্ভব ছিল। আর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে হিটলারের এই অপারগতা তাকে দ্রুত পতনের মুখে ঠেলে দেয।

রিনেট এবং এল হেসটোনের বইয়ে হিটলারের ঘনিষ্টতা পেয়েছিলেন এ ধরনের বেশ কিছু নারী এবং পুরুষের সাক্ষাৎকার রয়েছে। তাদের উক্তি উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, শিশুকাল থেকেই তিনি বিশ্বাস করতেন জার্মান জাতিকে বিশুদ্ধকরণের মাধ্যমে গোটা বিশ্বের শাসন ক্ষমতায় আনতে ঈশ্বর তাকে পাঠিয়েছেন।

অবশ্য বাল্যকালেই তার অসামান্য প্রতিভার পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় তিনি সর্বদা শীর্ষে অবস্থান করতেন। পরবর্তীতে তিনি চিত্রকলার প্রশিক্ষণ নেন। সেখানেও তার মেধা ফুটে উঠে। ভিয়েনায় আগত ভ্রমণকারীদের কাছে নিজের আঁকা বিভিন্ন ধরনের ছবি বিক্রি করে তিনি প্রচুর অর্থ বিত্তের অধিকারী হয়েছিলেন।

হিটলারের জীবন ছিল বৈচিত্রে ভরপুর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অষ্ট্রিয়া কর্তৃপক্ষ প্রাপ্ত বয়স্কদের সামরিক বাহিনীতে ভর্তির একটি জরুরী কর্মসূচি গ্রহণ করলে তরুন হিটলার বাধ্যতামূলক সেনাভূক্তির সেই আইন ফাঁকি দিয়ে অন্যত্র পালিয়ে যান।

তৎকালীন সময়ে কাজটা ছিল বড় ধরনের একটা অপরাধ। অবশ্য পরবর্তীকালে হিটলার বাভারিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এর কারণ সম্ভবত এই যে, তিনি ছিলেন রাজকীয় জার্মানীর চিন্তাধারায় বিশ্বাসী।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চার বছর হিটলার আগাগোড়া অত্যন্ত সাহসিকতার সংগে যুদ্ধ করেন। এই যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি গ্যাস বোমায় আহত হয়ে অনেকদিন পর্যন্ত শয্যাশায়ী ছিলেন।

পরে অসীম সাহসিকতার জন্য তাকে সম্মান সূচক ‘আয়রন ক্রস’ পদক দেয়া হয়।

তবে, একটা দিনের জন্যও হিটলার কর্পোরাল পদের উর্ধে উঠতে পারেননি। এর কারণ ছিল এই যে, সেনাবাহিনীর ডাক বিভাগে চিঠিপত্র বিলির কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে তার মত দক্ষতা ইতোপূর্বে আর কেউ দেখাতে পারেনি।

তাই কর্তৃপক্ষ তাকে চিরদিন এ বিভাগেই রাখার কথা চিন্তা ভাবনা করতেন। পক্ষান্তরে, চিঠি পত্র বিলির কাজটা তখন যে কোন সৈনিকের জন্য অফিসার পদে উন্নীত হয়ে দ্বায়িত্ব পালনের সংগে সংঘাতপূর্ণ বলে বিবেচিত হত।

তাই হিটলারের ভাগ্যেও বড় ধরনের কোন পদোন্নতি জোটেনি। তবে তার মেধা, বুদ্ধিমত্তা আর কর্মক্ষমতা যুদ্ধ শেষের সামান্য পরেই তাকে নেতৃত্বের সারিতে নিয়ে আসে।

হিটলারের উত্থান ও পতন আজও বিশ্ববাসীর নিকট বড় একটা বিস্ময়। গোটা বিশ্বকে পদদলিত করে নিরংকুশ একনায়কত্ব চালাবার স্বপ্ন সম্ভবত: আলেকজান্ডারের পর হিটলার ব্যতীত অন্য কারও ছিল না। আর সবাইকে চমকে দিয়ে তার সে উন্নত স্বপ্ন সার্থকতার পথে এগিয়েও যাচ্ছিল।

কিন্তু যে ব্যাপক রক্তপাতের কারণ হিসেবে তিনি কাজ করেছিলেন সে রক্তের ঋণ শোধ করবে কে? শতশত ছেলে হারা মা, স্বামী হারা বোন এবং অগণিত নিরীহ অথচ নিষ্পেষিত মানুষের আর্তনাদ যে খোদার আরশটাকে পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

তাই সত্য এবং ন্যায়ের দণ্ড নেমে আসতে বিলম্ব হয়নি। চতুর্দিক থেকে মিত্রবাহিনীর অবিচ্ছিন্ন আক্রমণ হিটলারকে দিশেহারা করে তোলে। আর রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সংগে সংগে তার স্বাস্থ্যও যেন হিটলারের সংগে বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে।

এই শেষোক্ত কারণটি জগতের অন্যতম প্রধান একজন এক নায়কের পতন ঘটাতে যে কি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিল-এল হেসটোন এবং রিনেট ।

হেসটোন তা দেখিয়েছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাত্র কিছুদিন পর থেকেই হিটলার অজীর্নতায় ভুগতে শুরু করেন। তবে এই অসুখটার জন্য প্রথম দিকে তিনি কোন ডাক্তারের শরনাপন্ন হননি।

প্রচলিত বিধি ব্যবস্থার প্রতি স্বভাবজাত বিতৃষ্ণার কারণে হোক-আর নিজের উপর পরীক্ষা চালানোর উদ্দেশ্যে হোক, হিটলার চেনা জানা কিছু দ্রব্য সামগ্রী দিয়ে একটা ঔষুধ তৈরি করে তা খেতে থাকেন।

কিন্তু অবস্থার কোন উন্নতি না হওয়ায় তিনি ‘ডা. কোয়েস্টারের বড়ি’ নামে পরিচিত একটা ঔষুধ সংগ্রহ করেন। সে সময় এই ঔষুধটি অজীর্নতার জন্যে সবাই খেত। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবহারে হিটলারের অসুখও সেরে যায়।

তবে সুস্থ হয়েও ঔষুধটি তিনি নিয়মিত সেবন করতেন। যতদূর জানা যায় তাতে দেখা গেছে, ‘ডা. কোয়েস্টারের বড়িতে’ নাক্সভমিকা এবং বেলেডোনা মিশ্রিত ছিল। বর্তমান যুগেও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকবৃন্দ অজীর্নতা দুর করতে এই উপাদান দুটো ব্যবহার করেন।

দেশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই হিটলার তার চেহারা এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কে অতিমাত্রায় সচেতন ছিলেন। এ সময়ে নিজের খাবার তালিকা প্রণয়নের ব্যাপারেও তিনি সবাইকে সজাগ ও সর্তক করে দিতেন।

একটুখানি এদিক-সেদিক হলেই বেঁধে যেত লঙ্কাকাণ্ড। তবে তার প্রাত্যহিক খাবার তালিকায় অন্যতম প্রধান উপদান ছিল বিস্কুট, মধু, দধি, ডিম এবং এক প্রকারের ছত্রাক। এছাড়া হিটলার নিয়মিতভাবে ফেনোলট থেলিস নামে পরিচিত একটি রাসায়নিক তরল পদার্থও সেবন করতেন। তার বিশ্বাস ছিল এই ঔষুধটি মানুষের ওজন বৃদ্ধি রোধ করতে পারে।

হিটলার মাত্রাতিরিক্ত চা, কফি বা মদ পান করতেন এমন কোন প্রমান নেই।

‘কোলা ক্যানডিস’ নামে পরিচিত একটি পানীয় তার খুব প্রিয় ছিল। হিটলার প্রত্যহ তা পান করতেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কোলা ক্যানডিসে সামান্য পরিমানের স্নায়ু উত্তেব্জক কেফিন যুক্ত ছিল।

সম্ভবত: এ কারণেই হিটলার নিয়মিতভাবে অনিদ্রায় ভুগতেন। আর এই অনিদ্রার উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গোটা সময় ধরে তিনি স্নায়ুর উত্তেজনা নিরোধক বারবিচুরেট খেতেন।

১৯৩৮ সালে হিটলার জনৈক চিকিৎসক ডা. থিয়ো মোরেলের তত্ত্বাবধানে আসেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

একথা ঠিক যে, হিটলারের সংগে ডা. থিয়ো মোরেলের গভীর হৃদ্যতা ছিল। তবে বিশ্বের অন্যতম এই একনায়কের পতন ত্বরান্বিত করতে ডা. থিয়ো মোরেলের বেশ বড় একটা ভূমিকা থাকার কথা এল হেসটোন এবং রিনেট হেসটোন তাদের বইয়ে উল্লেখ করেছেন।

তারা দেখিয়েছেন ডা. থিয়ো মোরেল একদিনের জন্যও হিটলারের স্বাস্থ্য পুরোপুরি পরীক্ষা করেননি বা সে ধরনের পরামর্শও তাকে দেননি। অথচ তৎকালীন জার্মানীতে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক এবং রেডিও লজিস্টগণ বাস করতেন।

প্রকৃত পক্ষে ডা. হিয়ো মোরেল ছিলেন একজন ফ্যাশনেবল বা প্রদর্শনবাদী চিকিৎসক। তার মত লোকদের উদাহরণ বর্তমান যুগেও রয়েছে। এসব চিকিৎসক প্রয়োজন বা রোগীর ক্রয় ক্ষমতা আছে কিনা সেদিকে না তাকিয়ে সদ্য বাজারে আসা ঔষুধের ব্যবস্থা পত্র লিখে দেন। আর ব্যবস্থা পত্রটিও ঔষুধে ঔষুধে একবারে ঠাঁসা থাকে।

ডা. থিরো মোরেলের অপর একটা বিকৃতি ছিল। ইঞ্জেকশন করা যায় এরূপ ঔষুধ পত্রের নাম লেখার প্রতি তিনি একটু খানি বেশি আগ্রহী ছিলেন। এমনকি শরীর ফুটো করার বিকল্প কোন ঔষুধের নাম শুনলেই নাকি তার মেজাজ সপ্তমে উঠতো।

অবশ্য এ ধরনের নিষ্ঠুর মানুষ হওয়া সত্বেও চিকিৎসক হিসেবে ডা. থিয়ো মোরেলের চাহিদা ছিল প্রচুর। বিশেষত: হিটলার ব্যক্তিগতভাবে তাকে খুব পছন্দ করতেন। মানুষকে দুঃখ দিয়ে আনন্দ পাবার নীতিতে মিল ছিল বলেই দুজনের মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল কিনা-এল এবং রিনেট হেসটোন তা উল্লেখ করেননি।

ডা. হিয়ো মোরেলের পরামর্শে হিটলার নিয়মিতভাবে মিথামফিটামিন গ্রহন করতেন। তবে নিশ্চিত করে বলা যাবে না কবে থেকে এটা শুরু হয়েছিল।

সম্ভবত: ১৯৪১-৪২ সালের মধ্যবর্তী সময় থেকে জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত ডা. থিয়ো মোরেল প্রত্যেহ সকালে এসে তার শিরায় একটা করে ইঞ্জেকশন দিয়ে যেতেন।

একই সংগে ভিটামিন যুক্ত কিছু বড়িও তিনি নিয়মিতভাবে খেতেন। ধারনা করা হয় মিথামফিটামিনের ক্রীয়া নিশ্চিত করার জন্য বড়ির সংগেও তা মেশানো থাকতো।

১৯৪৩ সালের মাঝামাঝি সময় হিটলারের মধ্যে ঔষুধটির পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াসমূহ অত্যন্ত স্পষ্ট আর প্রকট হয়ে উঠে। তখন তার বিরুদ্ধে প্রায়ই সহকর্মীদের সংগে অসহযোগীতা, অবিশ্বাস, অযথা বিরক্তি বোধ, ভাবাবেগের নিয়ন্ত্রনহীনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মারাত্মক রকম অপারগতার অভিযোগ শোনা যেত।

১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসটা ছিল তার জন্য খুবই দুর্যোগপূর্ণ। একদিকে মিত্র বাহিনীর জয় জয়কার-অপরদিকে তার ভগ্ন স্বাস্থ্য। সঠিক তো দূরের কথা সাদামাটা একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তিনি তখন সম্পূর্ণ অপারগ ছিলেন।

আর তাই শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই একনায়ককে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়।

এল হেসটোন এবং রিনেট হেসটোন তাদের বইয়ে এ কথাটা একটা বারের জন্যও অস্বীকার করেননি যে, হিটলারের বিভিন্নমুখি বিকৃতি তার পতন ঘটানোর জন্য দায়ী। তবে তারা জোড় দিয়ে বলেছেন এই পতন ত্বরান্বিত করতে এ্যামফিটামিনের বেশ বড় একটা ভূমিকা ছিল।
লেখক: কবি, গীতিকার ও কলামিস্ট
প্রভাষক, এনাটমী বিভাগ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!