বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:১১ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

১৩ জমিদারের গ্রামে নজর নেই

১৩ জমিদারের গ্রামে নজর নেই

image_pdfimage_print

।। এবিএম ফজলুর রহমান, পাবনা ।। ‘ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্যের সব দালানকোঠা। লাঠি-বল্লম-সড়কি হাতে পেটা শরীরের পাইক-পেয়াদা রয়েছে সেগুলোর ফটক পাহারায়। ভেতর থেকে ভেসে আসছে নারী-শিশুর কলতান। সন্ধ্যা হলেই মুহুর্মুহু শঙ্খধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠছে আশপাশের এলাকা।

হাজারো লণ্ঠন আর ঝাড়বাতির আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠা কোনো ভবনে হয়ত বসেছে কলকাতা থেকে আসা নামজাদা গায়েনদের গানের আসর। অথবা গ্রামের কোথাও না কোথাও বসেছে মেলা। গ্রামের পাশেই যমুনাপাড়ের ঘাটে বাঁধা রয়েছে জমিদারের সুদৃশ্য কোনো বজরা। একটু পরেই হয়ত কোনো জমিদার লোকজনসমেত তাতে চড়ে রওনা হবেন জমিদারি এলাকার দেখতে…।’

পাবনার বেড়া উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত হাটুরিয়া গ্রামের অতীতের বর্ণনা শুনে এমন দৃশ্যপটই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একসময় এ গ্রামে একসঙ্গে বাস করতেন ১৩ জন জমিদার। বৃহত্তর পাবনা জেলার বাইরেও বিস্তৃত ছিল তাদের জমিদারি। ১৩ জমিদারের গ্রাম হওয়ায় গ্রামটি ছিল প্রকৃতপক্ষেই চমকে দেওয়ার মতো বর্ণাঢ্য।

বর্তমানে ভাঙাচোরা দালানকোঠা আর কয়েকটি পুকুর ছাড়া ঐতিহ্যের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এক সময়ের জৌলুসে ভরা এ গ্রামটিতে এখন সমস্যার শেষ নেই। গ্রামে নেই ভালো রাস্তা-ঘাট। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে থাকে জলাবদ্ধতা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে মানুষের অসুখ-বিসুখ লেগেই আছে।

সবচেয়ে বড় কথা এ গ্রামের বাসিন্দাদের বড় অংশই নদীভাঙনে নিঃস্বপ্রায়। এ কারণে গ্রামবাসীর অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী।

এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, জমিদারি আমলে হাটুরিয়া গ্রামটি বৃহত্তর পাবনা জেলার অন্যতম অভিজাত এলাকা ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। কলকাতাতেও ছিল যমুনাপাড়ের এই গ্রামের সুখ্যাতি।

গ্রামের পার্শ্ববর্তী নৌবন্দর নাকালিয়া থেকে কলকাতার সঙ্গে ছিল সরাসরি নৌযোগাযোগ। এ গ্রাম থেকে নৌপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে খুব সহজে যাতায়াত করা যেত। এসব কারণে শুধু জমিদারেরাই নন, সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী ব্যক্তিরা এখানে বাস করতেন।

সেই সব জমিদার

একশ’ বছর আগে হাটুরিয়া গ্রামে দুই-একজন জমিদারের বাস ছিল। পরে এখানে একে একে বাড়তে থাকে জমিদারের সংখ্যা। একপর্যায়ে গ্রামে বসবাসকারী জমিদারের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় তেরতে।

তারা হলেন- প্রমথনাথ বাগচী, কাঞ্চিনাথ বাগচী, উপেন্দ্রনাথ বাগচী, ভবানীচরণ বাগচী, কালীসুন্দর রায়, ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়, সুরেন চন্দ্র রায়, সুধাংশু মোহন রায়, শক্তিনাথ রায়, বঙ্কিম রায়, ক্ষুদিরাম পাল, যদুনাথ ভৌমিক ও যতীন্দ্রনাথ ভৌমিক। প্রবীণ ব্যক্তিদের মতে, এসব জমিদারের হাটুরিয়া গ্রামে বসবাসের সময়কাল ছিল আনুমানিক ১৯১৫ বা এর পর থেকে। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির আগ পর্যন্ত তারা এ গ্রাম থেকেই পরিচালনা করতেন তাদের জমিদারি।

লোকমান পেয়াদার কথা

হাটুরিয়া গ্রামে গিয়ে জমিদার প্রসঙ্গ উঠতেই শোনা যায় লোকমান হোসেনের কথা। জমিদার প্রমথনাথ বাগচীর পেয়াদা ছিলেন তিনি। বয়স ইতিমধ্যে পঁচানব্বই পার করে ফেলেছেন।
অনেকের কাছে এখনও তিনি লোকমান পেয়াদা নামে পরিচিত। তার বাবা-দাদাও জমিদারের পেয়াদা ছিলেন। আলাপকালে শত বছরের কাছাকাছি লোকমান হোসেন শোনান নিজ চোখে দেখা জমিদার আমলের নানা কাহিনী।

তিনি জানান, ১৩ জমিদারের মধ্যে সবচেয়ে প্রজাবৎসল ছিলেন প্রমথনাথ বাগচী। আর প্রজাপীড়ক ছিলেন যদুনাথ ভৌমিক। এক গ্রামে এতজন জমিদার থাকা সত্ত্বেও তাদের মাঝে কখনও দ্বন্দ্ব-সংঘাত হতো না।

তবে পূজা-পার্বনসহ নানা উৎসব পালন করা নিয়ে তাদের মধ্যে চলত প্রতিযোগিতা। প্রত্যেকেরই কলকাতাতে বাড়ি ছিল। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর দেশ ভাগের আগে-পরে একে একে সবাই স্থায়ীভাবে কলকাতায় চলে যান।

লোকমান হোসেন আরও জানান, তিনি পেয়াদার কাজ করলেও জমিদার প্রমথনাথ বাগচী তাকে ছেলের মতো ভালোবাসতেন। দেশত্যাগের আগে প্রমথনাথ বাগচী তাকে বেশ কিছু জায়গা-জমি দান করে যান। সেগুলো থেকেই তিনি এখন এলাকার একজন সচ্ছল কৃষক।

অট্টালিকা আর পুকুরগুলোর করুণ দশা

জমিদারদের প্রত্যেকেই বাস করতেন প্রাচীরঘেরা অট্টালিকায়। অট্টালিকার পাশে ছিল শান বাঁধানো বড় পুকুর বা দীঘি। সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে কয়েকটি পুকুর ভরাট হয়ে গেছে। অবশিষ্ট রয়েছে ৬-৭টি। তবে এগুলোর বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত করুণ। একই দশা অট্টালিকাগুলোরও।

মালিকানা বদলের পর কিছু অট্টালিকা ভেঙে ফেলা হয়েছে, আর কিছু আপনা-আপনিই ধ্বংস হয়ে গেছে। সাক্ষী হিসেবে গ্রামে এখনও রয়ে গেছে দুই-তিনটি অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ। জরাজীর্ণ এসব অট্টালিকায় ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন কয়েকটি পরিবার।

এমনই একটি দ্বিতল অট্টালিকায় বাস করেন দিলীপ গোস্বামীর পরিবার। অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে ইজারা নিয়ে তারা এখানে বসবাস করে আসছেন।

দীলিপ গোস্বামীর ছেলে দীপক গোস্বামী জানান, অট্টালিকার এক স্থানে এর নির্মাণকাল ১৯১১ এবং নির্মাতা হিসেবে জমিদার ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়ের বাবা উমেশ চন্দ্র রায়ের নাম খোদাই করা ছিল।

ছেলেবেলায় তিনি এখানে সুপরিসর জলসাঘরসহ অনেক কক্ষ দেখেছেন। হলরুমে ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়ের পূর্বপুরুষের বেশ কিছু ছবি ছিল। জলসাঘরসহ সব কক্ষই জরাজীর্ণ। ছবিগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে। বিপজ্জনক জেনেও নিরুপায় হয়ে এখানে তারা বাস করছেন বলে তিনি জানান।

বেড়া মনজুর কাদের মহিলা কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক মনোয়ার হোসেন জানান, তার বাবা মরহুম মমতাজ উদ্দিন সিরাজগঞ্জের চৌহালী এলাকার জনৈক জমিদারের নায়েব ছিলেন। তার মুখে হাটুরিয়ার জমিদারদের অনেক কাহিনী তিনি শুনেছেন। মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এখন হাটুরিয়া নানা সমস্যায় জর্জরিত সাধারণ একটি গ্রাম। অথচ এখানেই একসময় দোর্দণ্ড প্রতাপশালী জমিদারেরা বাস করতেন।’

কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, শুধু সুখ-সমৃদ্ধিই নয়, শিক্ষা-দীক্ষাতেও এ গ্রাম ছিল সবার ওপরে। অথচ আজ এ গ্রাম থেকে শিক্ষার আলো যেন নিভে গেছে। অভাব-অনটনের কারণে গ্রামের ছেলেমেয়েদের বড় অংশ ঝুঁকছে উপার্জনের দিকে। এখানে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের প্রবণতা বেড়েই চলেছে। গ্রামবাসী আধুনিক সুবিধা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত।

হাটুরিয়া বাজারের সার ব্যবসায়ী মো. বাবু বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী এ গ্রামটির সমস্যার কথা বলে শেষ করা যাবে না। ভাবতে অবাক লাগে ১৩ জমিদারের গ্রামটির আজ এমন করুণ দশা।’

গ্রামে বিভিন্ন সমস্যার কথা স্বীকার করে হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সমস্যাগুলো সমাধানের পাশাপাশি বিলীন হতে বসা ঐতিহ্যগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।


পাবনার কৃতী সন্তান অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী

পাবনার কৃতী সন্তান অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী

পাবনার কৃতী সন্তান অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী

Posted by News Pabna on Tuesday, August 18, 2020

পাবনার কৃতি সন্তান নাসা বিজ্ঞানী মাহমুদা সুলতানা

পাবনার কৃতি সন্তান নাসা বিজ্ঞানী মাহমুদা সুলতানা

পাবনার কৃতি সন্তান নাসা বিজ্ঞানী মাহমুদা সুলতানা

Posted by News Pabna on Monday, August 10, 2020

© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!