News Pabna
ঢাকাবুধবার , ১ ডিসেম্বর ২০২১

১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর পাবনার নাজিরপুরে গনহত্যা সংঘটিত হয়

News Pabna
ডিসেম্বর ১, ২০২১ ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!


।। আমিরুল ইসলাম রাঙা।।
১৯৭১ সালে ১ ডিসেম্বর পাবনার নাজিরপুর গ্রামে ভয়াবহ গনহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাবনার সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশী মানুষকে একদিনে এবং একসাথে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সেদিন উক্ত গ্রামে ৬২ জন নীরিহ মানুষকে পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যা করে।

নাজিরপুর পাবনা শহর সংলগ্ন হেমায়েতপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম। শহর থেকে নাজিরপুর গ্রামের দুরত্ব সর্বোচ্চ ছয় কিলোমিটার। ভৌগোলিক ভাবে এই গ্রামের পূর্ব দক্ষিণ অংশে পাবনা মানসিক হাসপাতাল। দক্ষিণ পশ্চিম অংশে শানির দিয়াড় গ্রাম। পশ্চিম উত্তর অংশে টিকুরী গ্রাম। উত্তর পূর্ব অংশে মালিগাছা ইউনিয়ন এর খোদাইপুর এবং হেমায়েতপুর ইউনিয়নের আফরী ও পাটকিয়াবাড়ি গ্রাম।

১৯৭১ সালে নাজিরপুর গ্রামের প্রায় সব লোক ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। গ্রামটির পরিচিতি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রাম হিসেবে। অপরদিকে দক্ষিণ পশ্চিম অংশের গ্রাম হলো শানির দিয়াড়,কৃষ্ণ দিয়াড়, নিয়ামতুল্লাহপুর । যে গ্রামগুলো পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহযোগী নক্সাল বাহিনীর ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। পশ্চিম অংশে টিকুরী, তিনগাছা, শাহা দিয়াড় এবং দাপুনিয়া হাট পর্যন্ত গ্রামগুলো ছিল নক্সাল বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। মুক্তিযুদ্ধের নয়মাসে এই অঞ্চলে একাধিক বার মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকিস্তানি সৈন্য এবং নক্সালদের যুদ্ধ হয়।

১০ নভেম্বর টিকরী ও তিনগাছায় মুক্তিযোদ্ধা ও নক্সাল বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ হয়। উক্ত যুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা মহরম, বীর মুক্তিযোদ্ধা ছানা, বীর মুক্তিযোদ্ধা আতিয়ার ও জয়নাল শহীদ হন। অপরদিকে নক্সাল বাহিনীর অনেকে হতাহত হয়। এই অঞ্চলে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হয় ২৭ নভেম্বর। এদিন ভোররাতে প্রায় ৩ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা একত্রিত হয়ে শানির দিয়াড় ও শ্রীকৃষ্টপুর নক্সাল ঘাটিতে আক্রমণ করে। সেই যুদ্ধে নক্সাল বাহিনীর সাথে পাকিস্তানি সৈন্যরা যোগ দেয়। কয়েক ঘন্টাব্যাপী চলা সেই যুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর আলম সেলিম এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হামিদ শহীদ হন। সেই যুদ্ধে প্রতিপক্ষের ১৫/১৬ জন নিহত হয়।

২৭ নভেম্বর শানির দিয়াড় যুদ্ধের চারদিন পর ১ ডিসেম্বর ভোররাতে পাকিস্তানি সৈন্য এবং তাদের সহযোগীরা নাজিরপুর গ্রাম ঘিরে অসংখ্য মানুষকে আটক করে এবং বিভিন্ন বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুঠপাট করে। বিভিন্ন সুত্রে প্রকাশ সেদিন পাকিস্তানি সৈন্যরা আনুমানিক ৬২ জন মানুষকে একত্রিত করে নির্মমভাবে তাঁদের হত্যা করে। জানা যায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত ৬২ জনের মধ্যে প্রায় ৪০ জনের বাড়ি নাজিরপুর গ্রামে। বাকি নিহতরা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং তাঁদেরকে পরবর্তীতে সনাক্ত করা সম্ভব হয় নি।
নাজিরপুর গনহত্যায় নিহত শহীদেরা হলেন –
( ১). শহীদ লোকমান সরদার
(২). শহীদ জোনাব আলী সরদার
(৩). শহীদ মোয়াজ্জেম হোসেন
(৪). শহীদ রব্বেল সরদার
(৫). শহীদ পাঞ্জাব আলী
(৬). শহীদ চাঁদ আলী প্রাং
(৭). শহীদ কলুমুদ্দিন প্রাং
(৮). শহীদ খইরুদ্দিন প্রাং
(৯). শহীদ মালু প্রাং
(১০). শহীদ আব্বাস আলী
(১১). শহীদ সাকুব্বর আলী
(১২). শহীদ খোরশেদ আলী
(১৩). শহীদ ময়েজ উদ্দিন
(১৪). শহীদ আমিন উদ্দিন
(১৫). শহীদ আলতাজ প্রাং
(১৬). শহীদ ছমেদ প্রাং
(১৭). শহীদ বান্ডুল প্রাং
(১৮). শহীদ ইজ্জত প্রাং
(১৯). শহীদ টিপু প্রাং
(২০). শহীদ আসলাম প্রাং
(২১). শহীদ কুশাই প্রাং
(২২). শহীদ আজগর প্রাং
(২৩). শহীদ সোরহাব প্রাং
(২৪). শহীদ আহম্মদ প্রাং
(২৫). শহীদ ইউনুছ আলী
(২৬). শহীদ হিরাই প্রাং
(২৭). শহীদ মোকতার হোসেন
(২৮). শহীদ রাংতা প্রাং
(২৯). শহীদ আজারী প্রাং
(৩০). শহীদ মিরজান প্রাং
(৩১). শহীদ আজাহার প্রাং
(৩২). শহীদ মোতালেব সরদার
(৩৩). শহীদ শাজাহান আলী
(৩৪). শহীদ রহমত বিশ্বাস
(৩৫). শহীদ সলিম প্রাং
(৩৬). শহীদ সেকেন্দার আলী
(৩৭). শহীদ আকাই প্রাং
(৩৮). শহীদ মজিবর প্রাং
(৩৯). শহীদ জবা প্রাং
(৪০). শহীদ মশা প্রাং
পরিতাপের বিষয় স্বাধীনতা প্রাপ্তির পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত হলেও নাজিরপুর গনহত্যায় নিহত শহীদেরা এখনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায় নি। এখনো গনহত্যার স্থানে সরকারি ভাবে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয় নি। যা অতি জরুরী ভাবে করা দরকার। এই বিষয়ে স্থানীয় জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

লেখক –
আমিরুল ইসলাম রাঙা
রাধানগর মজুমদার পাড়া
পাবনা।
৩০ নভেম্বর ২০২১