News Pabna
ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৩ অক্টোবর ২০২২

ঘুরে এলাম কাপ্তাই লেক ও রাঙ্গামাটি

খন্দকার বায়েজিদ আহমেদ
অক্টোবর ১৩, ২০২২ ১০:৩৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

।।খন্দকার বায়েজিদ আহমেদ।।

সিদ্ধান্ত টা যদিও আচমকা তবুও চূড়ান্ত হল শেষে । আমরা কয়েক জন সহকর্মী মিলে কাপ্তাই লেক হয়ে রাঙ্গামাটি যাব, দেখব কাপ্তাই লেক, ঝুলন্ত ব্রিজ , রাঙ্গামাটি শহর এবং এর আশেপাশের প্রাকৃতিক নয়নাভিরাম দৃশ্যাবলী ।

দিনব্যাপী সফর সূচী আমরা আগেই ঠিক করে ফেলেছিলাম আমাদের এক স্থানীয় সহকর্মীর সহযোগিতায় ।সুতরাং আমাদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নাই এ ব্যাপারে । আমরা চট্টগ্রাম শহর থেকে বাসে করে কাপ্তাই এবং এরপর নৌকা যোগে কাপ্তাই লেক হয়ে স্থানীয় বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গাগুলো দেখে রাঙ্গামাটি শহর ঘুরে বাসে করে আবার চট্টগ্রাম ফিরে আসব ।ছুটির দিন ।শরতের শুভ্র সুন্দর সকাল । চট্টগ্রাম বাস স্টেশন ।একে একে সবাই এসে হাজির ।বহদ্দার হাট থেকে সকালের নাস্তা সেরে সবাই বাসে চেপে বসলাম । আমি পারসনালি খুব পুলকিত ছিলাম প্রথম বার যাচ্ছি বলে ।দলে ৫/৬ জন সঙ্গি , অনেকদিন পর একটা ভ্রমন এর স্বাদ পেতে যাচ্ছি ভাবতেই খুব ভাল লাগছে । আমি তো কল্পনায় লেকের স্বচ্ছ নীল টলমলে জলের সঙ্গে একাকার হয়ে যাচ্ছি ।আসলে গত দুই বছর করনা সঙ্কট এবং এক যুগের ও বেশি সময় ধরে থাকা প্রিয় কর্মস্থল ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রামে নতুন করে কাজ শুরু করতে গিয়ে আমিও হাঁপিয়ে উঠেছিলাম ।তাই মনের মধ্যে এত উচ্ছ্বাস আমাকে ভীষণ আন্দোলিত করে চলেছে ।আমাদের বাস ছুটে চলেছে চট্টগ্রাম – কাপ্তাই রোড ধরে । রাস্তার দুই পাশের বিভিন্ন স্থাপনা এবং এলাকার বর্ণনা দিয়ে চলেছেন আমাদের সহকর্মী আলম সাহেব । ভদ্রলোক বেশ অভিজ্ঞ এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এ দক্ষ ও বটে ।

অবাক প্রকৃতি, আমি অবাক তাকিয়ে রই
কাপ্তাই নেমে আমরা কিছু ছবি তুলে এবং চা নাস্তা সেরে আশপাশ টা দেখে নিলাম । এই ফাকে একজন গিয়ে নৌকা ঠিক করে আসলো । আরও কিছু হাল্কা খাবার দাবার কিনে আমরা চেপে বসলাম নৌকায় । আহা চারিদিকে স্বচ্ছ , শান্ত জলের উপর টিকরে পরছে দুপারের পাহাড়ি ঘন বনের সবুজ ছায়া ।আমি বিস্ময়ে বিমুঢ় প্রকৃতির এই স্নিগ্ধ মায়াবী অপরুপ দৃশ্যে ।স্রষ্টা কি নিপুণ দক্ষতায়, অপরুপ মমতায় এই মায়া ঢেলেছেন এখানে !!! নিজের চোখে না দেখলে এই অনুভুতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভভ না ।

ছবির মত মনোরম সুন্দর, যতদূর চোখ যায় , লোভী চোখ ফেরানো দায়

লেকের দুপাশ দিয়ে ছোটো ছোটো টিলার শরীর জুড়ে ঘন সবুজ তার মাঝখান দিয়ে আঁকাবাঁকা বয়ে চলা স্বচ্ছ হৃদের আপন পথ ।নৌকায় উঠে সবাই যে যার মতো লেকের দুপাশের চমৎকার দৃশ্যাবলী অবলোকন করতে লাগলো ।আমিও প্রচণ্ড উচ্ছ্বসিত হলেও জুনিয়র কলিগদের সামনে প্রকাশ করতে পারছিলাম না । যাইহোক কাপ্তাই লেক ধরে আমাদের নৌকা যতই এগিয়ে যাচ্ছিলো ততই আমাদের মুগ্ধতা বাড়ছিলো ।হয়ত এমন সব দৃশ্য দেখেই জীবনানন্দ লিখেছিলেন “ …বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই আর চাইনাকো দেখিতে পৃথিবীর মুখ ……” সত্যি মুগ্ধতার এমন আবেশি মুহূর্তে

শান্ত জল রাশি রাশি, দূরে টিলার উপর পাহাড়ি ঘর ,কে তুমি সাঁজাও সংসার এই ঘন অরণ্যে একা ?

জীবনের আর সব আয়োজন বড্ড তুচ্ছ মনে হয় ।কেবলি মনে হয় এক জীবন যদি এই ঘোরের মধ্যেই কাটিয়ে দেয়া যেত ? কিন্তু আরও কিছুটা সামনে গিয়ে বুঝলাম এখানকার জনজীবন সহজ এবং আয়েশি নয় । বরং বেশ কঠিন এবং সংগ্রামী । যদিও এখানে জনবসতি খুব কম । লেকের পাড়ে পাহাড়ি এলাকায় দুএকটা বাড়ি ঘর দেখা যায় । যাদের জীবন জীবিকা একমাত্র মাছ শিকার, কিছুটা পশুপালন অথবা জুম চাষ নির্ভর । সমতল থেকে এই এলাকা বেশ দূরে ফলে সভ্যতার অনেক উপকরন ই এখানে অনুপুস্থিত । এজন্যই পাহাড়ি মানুষ এত পরিশ্রমি , কষ্টসহিষ্ণু এবং প্রতিবাদী ।প্রায় আধুনিক জীবন উপকরনের সকল সুবিধা ছাড়াই তাদের এই জীবন ।ভাবতে অবাক লাগে ! তার মানে মানুষ চাইলে যেকোনো পরিস্থিতিতে জীবন যাপন করতে পারে । আমরা আসলে আমাদের চারপাশের পরিবেশ এবং পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত ।

দেখতে দেখতে দুপুর হয়ে গেল । পেটের মধ্যে ক্ষুধার মোচড়ানই মনে করিয়ে দিচ্ছে খাবার সময় হয়ে গেছে । একটা জাইগায় আমরা নৌকা থামিয়ে লেকের পানিতে গোসল করে দুপুরের খাবার খেলাম । বেশ মজাদার খাবার । বাঁশের মধ্যে মুরগির মাংস রান্না , ছোট মাছ , ভরতা এবং ডাল । হয়তবা প্রচণ্ড ক্ষুধা এবং বিশেষ ধরণের স্থানীয় রান্না যেকোনো কারনেই হোক খাবার আমরা সবাই তৃপ্তি সহকারেই খেলাম ।

যতটা সুন্দর দুচোখ ভরে দেখা যায়
বেলা হেলে পরেছে পশ্চিম আকাশে । দ্রুত আবার চলা শুরু হলো ঝুলন্ত ব্রিজ হয়ে রাঙ্গামাটি শহরের দিকে ।লেকে পানি কম থাকায় ঝুলন্ত ব্রিজ খুব বেশি আকর্ষণীয় মনে হল না যতটা ছবিতে সুন্দর । এরপর আমরা রাঙ্গামাটি শহর ঘেঁষে লেক এর পারে একটি পার্ক ঘুরে দেখলাম । অসম্ভব সুন্দর । আমার ধারনা বর্ষা কালে যখন পানিতে পূর্ণ থাকে তখন এখানকার সৌন্দর্য আরও অপরুপ হয়ে ওঠে ।

বেলা যে যায় আহা অবেলায়

সুখ স্মৃতি দ্রুত মিলিয়ে যায় । ফুঁড়িয়ে যায় হৃদয়ের ব্যাকুলতা । সারাদিনের ক্লান্তি আর অসম্ভব ভাললাগার এক অপার্থিব অনুভুতি নিয়ে আমরা নৌকা থেকে রাঙামাটি শহরে নেমে পরলাম । কিছু কেনাকাটা এবং চা নাস্তা সেরে আমরা চট্টগ্রাম এর বাস ধরলাম । পেছনে পরে রইল এক সময়ের অশান্ত পাহাড়ি জনপদ রাঙ্গামাটি । পাহাড়ি উঁচু নিচু পথ ছেঁড়ে আমরা ক্রমশ সমতল ভুমিতে এগিয়ে চলেছি । বুকের ভেতরে আমার কেমন যেন বিষাদের সুর ।

লেখক –একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক- লজিসটিক, হিসাবে কর্মরত ।

error: Content is protected !!