ধর্মাশ্রয়ী ও সস্তা রাজনীতির পথে নূর

নাজমুল আশরাফ

বিনোদন জগতে অনেকেই হঠাৎ তারকা বনে যান। নির্দিষ্ট কোনো গান গেয়ে বা নাটক-সিনেমার নির্দিষ্ট কোনো চরিত্রে অভিনয় করে আলোচনায় আসার ঘটনা নতুন কিছু না। শুধু বিনোদন কেন, অন্য অনেক ক্ষেত্রেও এমন ‘হঠাৎ তারকা’ দেখা যায়। এসব ‘হঠাৎ তারকা’ আবার হঠাৎ করেই হারিয়ে যান। কারণ তাদের ভিত্তি দুর্বল থাকে, অভিজ্ঞতা কম থাকে, সামগ্রিক মানের ঘাটতি থাকে, এবং সর্বোপরি কাজটার প্রতি অঙ্গীকার থাকে না। তাদের লক্ষ্য থাকে যেনতেনভাবে রাতারাতি বড় হওয়া। রাজনীতিতেও মাঝে মাঝে ‘হঠাৎ তারকা’র দেখা মেলে। দ্রুত উত্থানের মতো তাদের পতনও দ্রুত হয়। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তেমনই এক ‘হঠাৎ তারকা’কে দেখা যাচ্ছে।

২৮ বছর পর ২০১৯ সালে যখন ডাকসুর নির্বাচন দেওয়া হয় তখন সবাই আশা করেন, ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের কল্যাণে আবারও ভূমিকা রাখতে শুরু করবে। সত্যিকার গণতন্ত্র চর্চার উদাহরণ তুলে ধরবে দেশের শীর্ষ এই বিদ্যাপীঠ। ছাত্র রাজনীতির গৌরব ফিরিয়ে আনতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে ডাকসু এবং আবাসিক হল সংসদগুলো। কিন্তু সেই প্রত্যাশা প্রথমেই হোচট খায় নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগের কারণে। অতীতে যারা ডাকসুর ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের প্রায় সবাই জাতীয় নেতায় পরিণত হয়েছেন। প্রতিটি ডাকসুই ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯০ সালে নির্বাচিত ডাকসু এরশাদের স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটায়। স্বাধীনতার আগে ও পরে জাতীর প্রতিটি সংকটেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে শত বছরের পুরানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেজন্যই এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ‘গণতন্ত্রের সূতিকাগার’ হিসাবে পরিচিত।

টানা ২৮ বছর ডাকসু ও হল সংসদ না থাকায় সেই ইতিহাসে বড় ধরনের ছেদ পড়ে। এই ২৮ বছরে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, তাদের কাছে সেই ইতিহাস শুধুই ইতিহাস। কিন্তু ২০১৯ সালে যারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন, তাদের জন্য ডাকসু ও হল সংসদের জীবন্ত রূপ দেখার একটা সুযোগ আসে। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতির সুফল ভোগ করার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়। একই সাথে জাতীয় নানা সংকটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা রাখার সুযোগও তৈরি হয় দীর্ঘ ২৮ বছর পরে। ২০১৯ সালে বহু কাঙ্ক্ষিত ডাকসু নির্বাচনে দলীয় রাজনীতির লেজুরবৃত্তি করা ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মতো সংগঠনগুলোকে পিছনে ফেলে ভিপি নির্বাচিত হন, সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতা নুরুল হক নূর। কোটাবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন এই সংগঠনটির জন্ম। এত বছর পর ডাকসু নির্বাচনে বিপ্লব করে ফেলবে সেটা নিশ্চয়ই কেউ আশা করেনি। কিন্তু পুনরুজ্জীবিত ডাকসু তার কাঙ্ক্ষিত ভূমিকার শুরুটা অন্তত করবে, এমন আশা নিশ্চয় অনেকেই করেছেন। কিন্তু জিএস ও এজিএসসহ ডাকসুর বেশিরভাগ পদে নির্বাচিত ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে ভিপির প্রকাশ্য এবং সহিংস দ্বন্দ্ব চলে ডাকসুর এক বছর মেয়াদের পুরোটা জুড়েই। নামে-বেনামে ছাত্রলীগ কর্মীরা ভিপি নূরের ওপর অনেকবার হামলা চালায়। তাতে নূরের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ সারাদেশের মানুষেরই সহানুভূতি তৈরি হয়। মূলত তাদের এমন বিরোধের কারণেই ২৮ বছর পর পাওয়া ডাকসু সবচেয়ে ব্যর্থ ডাকসুতে পরিণত হয়। অন্যদিকে, নিজের অরাজনৈতিক সংগঠনের বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি ভিপি নূর। ছাত্রলীগের বিরোধিতা ও অসহযোগিতার কথা বলে নিজের ব্যর্থতাকেও আড়াল করার চেষ্টা করেন তিনি।

ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর নূর যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করতে যান, তখন নিজেকে এক সময়ের ছাত্রলীগ কর্মীর পরিচয় দিয়ে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। কিন্তু দ্রুতই তিনি রাজনৈতিক অবস্থান পাল্টে ফেলেন। এক পর্যায়ে ডাকসুর শীর্ষ নেতার দায়িত্ব পালনের বদলে ছাত্রলীগ-বিরোধী রাজনীতি শুরু করেন তিনি। সাথে যোগ হয় তার সরকার-বিরোধী রাজনীতি। যাদের জন্য এবং যাদের দ্বারা তিনি ভিপি নির্বাচিত হন, তাদের কথা ভুলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের ভূমিকায় নামে নূরের ছাত্র সংগঠন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কিছু করতে না পারলেও জাতীয় নানা বিষয়ে নূরের রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়তে থাকে। এরপর ডাকসুর মেয়াদ শেষে সাবেক হয়ে যাওয়া ভিপি পুরোদস্তুর জাতীয় রাজনীতির চর্চা শুরু করেন। জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রকাশ্য কোনো অভিভাবক না থাকলেও, বিএনপি-জামায়াত জোটের রাজনীতি নিয়ে পুরোদমে মাঠে নামে নূরের সংগঠন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব বিষয়েই নিজেদের এবং অন্যদের কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নিতে থাকেন ডাকসুর সাবেক ভিপি নূর। সামাজিক মাধ্যমেও শুরু হয় তার নিয়মিত উপস্থিতি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার এবং ভারতের বিরুদ্ধে শুরু হয় ছাত্রনেতা নূরের বিষোদ্গার।

সরকারের দমন-পীড়ন আর অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত বিএনপিসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন দল ও ব্যক্তি নূরের ওপর ভর করতে থাকেন। নিজের সংগঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে সরকার ও ভারতবিরোধী বক্তব্য রাখতে শুরু করেন ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূর। ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করেন এবং ধর্মকে যারা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেন, তাদের সাথে নূরের সখ্যতা গড়ে ওঠে। এই উপমহাদেশে বারবার ব্যর্থ ও প্রত্যাখ্যাত ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি ও সস্তা ভারত-বিরোধিতায় সরব হয়েছেন ভিপি নূর। এই রাজনীতিতে বিশ্বাসীরা তাকে নানাভাবে মদদ দিচ্ছেন। তাছাড়া আওয়ামী-বিরোধীরা তো আছেনই। ইউটিউবসহ নানা সামাজিক মাধ্যমে যারা ধর্মের নামে উন্মাদনা ছড়ান, অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে যারা কথায় কথায় আক্রমণ করেন, তাদের কাছে নূর খুবই সমাদৃত হচ্ছেন। বাদ যাচ্ছেন না বিএনপি-জামায়াত জোটের অনুসারীরাও। বাংলাদেশের মুসলমানরা ধার্মিক হলেও ধর্মান্ধ নন, নূর হয়তো এ কথা ভুলে গেছেন।

নূরের এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে তারই সংগঠনের এক নারী কর্মীকে ধর্ষণের অভিযোগ সম্পর্কে নূর যে ধরণের নারীবিদ্বেষী ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা জাতীয় নেতা হতে ইচ্ছুক কারো আচরণ হতেই পারে না। সাধারণ কোনো মানুষের ক্ষেত্রেও এমন বক্তব্য মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এখানেই শেষ নয়। এ বিষয়ে ৭১ টিভির সাথে তিনি যা করেছেন, সেটা আরো জঘন্য। একটা জাতীয় সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে কর্মীদের লেলিয়ে দেওয়া কোনো নেতার কাজ হতে পারে না। তিনি নেতা হতে চান অথচ জবাবদিহি করতে চান না। ৭১ টিভির অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দিতে নাও চাইতে পারেন। কিন্তু সেই টিভির বিরুদ্ধে মিথ্যাচার, বিষোদগার, ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো কোনো সুস্থ ও বিবেকবান মানুষের কাজ হতে পারে না। নূর ও তার অনুসারীদের পাশাপাশি, সরকারবিরোধী নানা শক্তিও একই তৎপরতা চালাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে, যেখানে সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ এবং উচিত-অনুচিতের কোনো বালাই নেই। ৭১ টিভি বর্জনের নূরের আহ্বানের পর একই কাজ করছে বিভিন্ন ধর্মান্ধ ও উগ্রবাদী শক্তিও। ডিবিসি নিউজ ও সময় টিভির বিরুদ্ধেও বিষোদগার করছে তারা। কোনো সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় নীতি সবার পছন্দ হবে এমন কোনো কথা নেই। তাই বলে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে আন্দোলন কোনো সুস্থ রাজনীতি হতে পারে না। বাংলাদেশের গণতন্ত্র বা রাজনীতি যেটুকু টিকে আছে, সেটা গণমাধ্যমের কল্যাণেই। সংসদ ও বিরোধী রাজনীতি যেখানে ব্যর্থ, সেখানে গণমাধ্যমই এখনো সরকারকে জবাবদিহিতার মধ্যে রেখেছে। সরকার ও সমাজের অন্যায়-অবিচার তুলে ধরছে গণমাধ্যমই। গণমাধ্যমের খবর নিয়েই রাজনীতি করছেন নূরের মতো সরকার-বিরোধীরা। এমন বাস্তবতায় গণমাধ্যমবিরোধী রাজনীতি করে ভিপি নূর কার স্বার্থ রক্ষা করছেন? নানান সমালোচনা, দুর্বলতা আর সীমাবদ্ধতার পরও গণমাধ্যমই এখনো মানুষের শেষ ভরসা। সেই ভরসাটা ধংস করে নূর কার উপকার করতে চাইছেন? উগ্র ধর্মান্ধ শক্তি সক্রিয় হলে নূরের রাজনীতি কোথায় যাবে?

সরকারের বিরাগভাজন হলে যখন বিএনপির মতো বড় দলের নেতা-কর্মীরাও রেহাই পান না, তখন নূর কীভাবে বহাল তবিয়তে থাকেন? নূরের চেয়ে অনেক কম মাত্রায় সরকার ও ভারত-বিরোধিতা করেও অনেকে গায়েব হয়ে যান, নয়তো কারাগারে যান। মামলার বোঝা তো থাকেই। ধর্ষণে সহযোগিতা এবং সামাজিক মাধ্যমে মানহানির মতো মামলা নিয়েও বীরদর্পে রাজনীতি করছেন নূর। ৭১ টিভির মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেও তিনি নিরাপদেই আছেন। নূর প্রায়ই বলে থাকেন, গোয়েন্দারা তাকে নানাভাবে লোভ ও ভয় দেখান। কিন্তু তিনি তাদের পাত্তা দেন না। প্রশ্ন আসতেই পারে নূরের শক্তির উৎস কী? কারা নূরকে জাতীয় নেতা বানানোর চেষ্টা করছেন? বিএনপির বিপরীতে নতুন রাজনৈতিক শক্তি দাঁড় করানোর প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতা সম্পর্কে কমবেশি সবাই জানি আমরা। সেসব চেষ্টায় দেশি-বিদেশি শক্তির জড়িত থাকার কথাও জানেন সচেতন নাগরিকরা।

এরইমধ্যে রাজনৈতিক দল গঠনের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছেন তিনি। জাতীয় রাজনীতির এই বন্ধ্যাত্বের সময়ে নূরের মতো তরুণ নেতার রাজনীতিতে আসা নিশ্চয়ই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় পর্যায়ে একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নূরের কী অভিজ্ঞতা আছে? কোটা পদ্ধতির বিরোধিতা করার মতো একটি জনপ্রিয় বিষয়ে ক্যাম্পাসে আন্দোলন গড়ে তোলা এবং সেই জনপ্রিয়তা দিয়ে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হওয়া কারো জাতীয় নেতা হওয়ার জন্য যথেষ্ট কিনা। ডাকসুর ভিপি হিসাবে ব্যর্থতা কোনো যোগ্যতা কিনা। তবে এটাও ঠিক, রাজনীতিতে কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াও অনেকেই মন্ত্রী-এমপি হয়ে গেছেন। কিন্তু নূরের বাস্তবতাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেখানে বিএনপির মতো দলের অস্তিত্বই টের পাওয়া যায় না, সেখানে নতুন দল গঠন করে সফল হওয়া কতটা সম্ভব? ড. কামাল হোসেন, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কর্নেল (অব.) অলি আহমদ এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো জাদরেল রাজনীদিবিদরা যেখানে তৃতীয় ধারার রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটাতে পারেননি, সেখানে নূরের মতো রাজনীতির ‘হঠাৎ তারকা’র পক্ষে কি সেটা করা সম্ভব? যদিও রাজনীতিতে নবাগত নতুন নেতৃত্বের সাফল্য অনেক দেশেই আছে। সে রকম বিরল সাফল্য পাওয়ার জন্য দরকার বিরল ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতা। নূরের মাঝে সেসব গুণ কতটুকু আছে?

নাজমুল আশরাফ: প্রধান সম্পাদক, টিবিএন২৪




পাবনার কৃতি সন্তান প্রখ্যাত ছাত্র নেতা ও বাম রাজনীতিক শফি আহমদ

। আমিরুল ইসলাম রাঙা।
পঞ্চাশ এবং ষাট দশকে পাবনার ছাত্র রাজনীতিতে কিংবদন্তি ছাত্র নেতা শফি আহমদ। আমাদের চোখে পাবনার বঙ্গবন্ধু। শেখ মুজিবুর রহমানের মত চেহারা, উনার মত উচ্চতা, উনার মত বক্তৃতা, সর্বপরি বঙ্গবন্ধুর সাথে শফি আহমদের অনেক মিল ছিল। উনারা বিপরীত মুখী রাজনীতি করলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পাবনার শফি আহমদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ১৯৬২ সালের শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে বঙ্গবন্ধুর সাথে নির্বাচনী প্রচারনা, ১৯৬৬ সালে ৬ দফা ১১ দফার পক্ষ সমর্থন করা, ১৯৬৮-৬৯ সালে গণআন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা সহ মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম সংগঠক হিসেবে কাজ করা, এসবই ছিল বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের সাথে শরীক থাকা। স্বাধীনতার আগে ও পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে বহু স্মৃতি বিজড়িত আছে।

আমিরুল ইসলাম রাঙা

শফি আহমদের সাথে স্মৃতি আছে আমার। স্মৃতি আছে পাবনাবাসীর। শফি আহমদ ছিলেন পাবনার ছাত্র রাজনীতির এক প্রবাদ পূরুষ। তাঁর হাত ধরে রাজনীতিতে এসে পাবনার রাজনীতি এমনকি জাতীয় রাজনীতিতেও নেতা হয়েছেন। তবে শফি আহমদ জাতীয় নেতা না হলেও জাতীয় ছাত্রনেতা হয়েছিলেন। একসময় পাবনা সহ গোটা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে ছিল তাঁর পরিচিতি। আমাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল ও অম্লান শফি আহমদকে আজকের প্রজন্ম কয়জন চিনেন? যেনারা শফি আহমদকে চিনতেন তাঁদের স্মৃতি থেকে হয়তো আজ বিস্মৃতি হয়ে গেছেন।

শফি আহমদ ছিলেন পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক। ১৯৬১-৬২ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ ছাত্র-সংসদের জি,এস। পাবনার ছাত্র রাজনীতির এই প্রবাদ পূরুষ ১৯৬৬-৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ ডাকসু’র জি,এস হয়েছিলেন । পাবনা থেকে ঢাকা এবং ঢাকা থেকে গোটা দেশব্যাপী ছিল তাঁর পরিচিতি। এমন ছাত্রনেতা পাবনায় আর দ্বিতীয় জন হতে পারেন নাই। এমন পরিচয়ের শফি আহমদকে আজ আমরা কয়জন চিনি? কয়জন তাঁকে স্মরণ করি?

শফি আহমদ ১৯৩৯ সালে পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন। শহরের পৈলানপুর পাওয়ার হাউস সংলগ্ন সাবের মঞ্জিল হলো পৈত্রিক বাড়ী। পিতা আলহাজ্ব সাবের আলী, মাতা মোছাঃ রাবেয়া খাতুন। শফি আহমদ বাবা মায়ের পঞ্চম সন্তান। বাবা তৎকালীন পুলিশ সুপার অফিসের হেড ক্লার্ক ছিলেন। ১৯৫৪ সালে হজ্জ পালন করতে গিয়ে মক্কানগরীতে ইন্তেকাল করেন। তাঁদের পাবনা শহরে অত্যন্ত পরিচিত এবং সম্ভ্রান্ত হিসেবে গন্য করা হয়। তাঁদের বাড়ীতে লজিং থেকে অনেক খ্যাতিমান মানুষ এডওয়ার্ড কলেজে লেখাপড়া করেছেন। বড় ভাই এডভোকেট সালেহ আহমদ, ছোট ভাই পাবনা জেলা গণতন্ত্রী পার্টির সাধারন সম্পাদক সুলতান আহমদ বুড়ো। ছোট ভাই সিরাজ আহমদ আনসার ভিডিপির কর্মকর্তা। তাঁরা দুই ভাই গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা।

শফি আহমদ ১৯৫৭ সালে পাবনা জিলা স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাশ করে এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। এরপরে অল্পদিনের মধ্যে তাঁর যোগ্যতার স্বীকৃতি পান। পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬১-৬২ সালে এডওয়ার্ড কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনে জি,এস পদে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ তখন উত্তরাঞ্চলে বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ছাত্র রাজনীতির সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ছিল। অল্পদিনে শফি আহমদের পরিচিতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬২ সালে শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে পাবনায় শফি আহমদ বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রদান করেন। এরপর পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে বি,এ পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তখন ছাত্র ইউনিয়ন সারাদেশে শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত ছিল। অবিভক্ত ছাত্র ইউনিয়নে তখন কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন রাশেদ খান মেনন এবং সাধারন সম্পাদক ছিলেন মতিয়া চৌধুরী। ঠিক সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ ডাকসু’র ১৯৬৬-৬৭ নির্বাচনে শফি আহমদ জি,এস পদে মনোনয়ন পান এবং বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। সেবার ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী।

শফি আহমদ ১৯৬৮-৬৯ এর গণ-আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ন্যাপ প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন। ১৯৭১ সালে মার্চ মাসের শুরুতে অসহযোগ আন্দোলন এবং ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষনের পর মুক্তিযুদ্ধের জন্য ভূমিকা রাখেন এবং সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে পাবনা জেলা ন্যাপের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭৩ সালে পাবনা পৌরসভা নির্বাচন করেন। তিনি আশির দশকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সদস্য হন। ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। রাজনীতিতে ন্যাপের ভাঙ্গন পরবর্তীতে একতা পার্টি হয়ে সর্বশেষ গনতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাথে জড়িত হন।

শফি আহমদ ১৯৯১ সালে ২৫ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর স্ত্রী রেখে যান। তাঁর কোন ছেলে-মেয়ে ছিল না। তাঁর স্ত্রী ঢাকা তেজগাঁও মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রয়াত শফিনাজ বেগম। মৃত্যুর আগে শফি আহমদ গনতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। পাবনা প্রেসক্লাবের সদস্য ছিলেন। তিনি স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ – আফগানিস্তান মৈত্রী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশ – ভারত মৈত্রী সমিতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদের সাথে জড়িত ছিলেন। অকুতোভয় বীর আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নিলেও তাঁর স্বজন প্রিয়জনদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

(শেষ)
লেখক পরিচিতি –
আমিরুল ইসলাম রাঙা
রাধানগর মজুমদার পাড়া
পাবনা।
২৫ অক্টোবর ২০২০




পাবনায় মুক্তিযুদ্ধকালীন এফ.এফ কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন সন্টু

। আমিরুল ইসলাম রাঙা।
পাবনায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন সন্টু। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ছাত্রজীবনে ভাসানীপন্থী ছাত্র ইউনিয়নে ( মেনন) জড়িত থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে ২৮ ও ২৯ মার্চ পাবনায় প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন। ১০ এপ্রিল পর্যন্ত নগরবাড়ী ঘাটে অবস্থান করে প্রতিরোধ যুদ্ধ করেন। এরপর ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহন করে ৭ নং সেক্টরের অধীনে যুক্ত হন। সীমান্ত এলাকায় একাধিক যুদ্ধে অংশগ্রহন শেষে পাবনার এফ.এফ কমান্ডার নিযুক্ত হন। পাবনায় ঐতিহাসিক শানির দিয়াড় যুদ্ধ, সুজানগর থানা আক্রমণ সহ অনেকগুলি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসীকতার সাথে যুদ্ধ করে বীরত্ব গাঁথা ইতিহাস রচনা করেন।

আমিরুল ইসলাম রাঙা

বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন সন্টু পাবনার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। বাবা এ,কে,এম মনসুর আলী ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন। দাদা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। পিতা ও পিতামহের আদি ভিটা সুজানগর উপজেলার মানিকহাট ইউনিয়নের মাজপাড়া গ্রাম। পরবর্তীতে পাবনা শহরের থানা পাড়ায় বসবাস। তাঁরা ৫ ভাই এবং ৫ বোন। ভাইদের মধ্যে চতুর্থ হলেন, মকবুল হোসেন সন্টু। বড় ভাই ফজলুল করিম বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদের ভায়রা। মেজ ভাই হাসিবুল হাসান হাবুল, তৃতীয় ভাই তোসাদ্দেক হোসেন বেনু এবং ছোট ভাই মোশারফ হোসেন বাবলু। তাঁরা পাবনা শহরে অত্যন্ত পরিচিত।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন সন্টু ১৯৪৩ সালের ৬ জুন বাবার কর্মস্থল জামালপুর জেলা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মাতার নাম মোছাঃ হেলেন রশীদা। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে পাবনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে আইএ ভর্তি হন। সেখানে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের সাথে জড়িত হন। ১৯৭১ সালে বিএ পরীক্ষার আগে মুক্তিযুদ্ধে জড়িত হন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তান সৈন্যরা পাবনা শহরে অবস্থান গ্রহণ করেন। ঐদিনই পাকিস্তানী সৈন্যরা শহর থেকে আওয়ামী লীগের নব-নির্বাচিত এমপিএ এডভোকেট আমিন উদ্দিন, ন্যাপের জেলা সভাপতি ডাঃ অমলেন্দু দাক্ষী, রাধানগর তৃপ্তি নিলয় হোটেলের মালিক ও মটর ব্যবসায়ী সাঈদ উদ্দিন তালুকদার সহ অসংখ্য ব্যক্তিকে আটক করে। ২৭ মার্চ গভীর রাত থেকে পাবনা টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অবস্থানরত পাকিস্তানী সৈন্যদের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনতা প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। পরেরদিন ২৮ মার্চ দুপুরে আগে টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অবস্থানরত সমস্ত সৈন্যকে হত্যা করা হয়। একই দিন পাবনার লস্করপুরে (বর্তমান বাসটার্মিনাল) অবস্থানরত সৈন্যদের সেখানে হত্যা করা হয়। সেখানে প্রথম শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা শামসুল আলম বুলবুল ( যার নামে শহীদ বুলবুল কলেজ) সহ ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা। পরের দিন পাবনা শিল্প এলাকায় ( বিসিক) অবস্থানরত পাকিস্তান সৈন্যরা সেখান থেকে পলায়ন করলে প্রায় ১৭ টি স্থানে খন্ড খন্ড যুদ্ধে সমস্ত সৈন্যরা নিহত হয়। ২৯ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা শহর মুক্ত ছিল। পাকিস্তানী সৈন্যরা নগরবাড়ী ঘাট হয়ে দ্বিতীয় দফায় পাবনা প্রবেশের চেষ্টা করলে সেখানেও প্রতিরোধ যুদ্ধ হয়।
পাবনায় প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন সন্টু সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। উক্ত যুদ্ধে তাঁর মেজ ভাই হাসিবুল হাসান হাবুল অস্ত্র হাতে পাকিস্তানী সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ১০ এপ্রিল পাকিস্তানী সৈন্যরা দ্বিতীয় দফায় পাবনা প্রবেশ করলে মকবুল হোসেন সন্টু এবং তার পরিবার সুজানগর উপজেলার মানিকহাট ইউনিয়নের মাজপাড়া গ্রামে আশ্রয় নেয়। এপ্রিল মাসে পাকিস্তানীরা সৈন্য এবং তাদের দোসররা ব্যাপক হারে গনহত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে। এপ্রিল মাসের শেষদিকে মকবুল হোসেন সন্টু তাঁর আপন ছোট ভাই মোশারফ হোসেন বাবলু এবং আপন চাচাতো ভাই তালেবুল ইসলাম রাজুকে নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। কয়েকদিন ধরে হেঁটে তারা কুষ্টিয়া হয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেন। পথিমধ্যে পাবনা-কুষ্টিয়ার মধ্যবর্তী ডিগ্রীচরে ডাকাতদের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারান। জিনিসপত্র হারালেও তাদের জীবন ফিরে পান। ডাকাতরা তাদের হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। ডাকাতদের কাছে জীবন ফেরত পাওয়া আর ছোট ভাইয়ের কাছে লুকিয়ে রাখা এক’শ টাকা থাকায় তাদের মধ্যে আবার শক্তি সঞ্চয় হয়। এরপর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন। প্রথম দফায় ডাকাতদের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে পারলেও দ্বিতীয় দফায় জীবন বাঁচানো ছিল আরো অস্বাভাবিক।

ভারতে প্রবেশ করার পর শরনার্থীদের দুরবস্থা দেখে তাঁরা কলকাতা চলে যান। সেখান থেকে তার দুই ভাইকে আসামে পাঠান। আসামে তাদের এক চাচা বসবাস করেন। দুই ভাইকে আসামে পাঠিয়ে মকবুল হোসেন সন্টু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ট্রেনিং নেওয়ার জন্য পাবনার জন্য নির্ধারিত ট্রানজিট ক্যাম্প নদীয়া জেলার কেচুয়াডাঙ্গা আসেন। সেখানে আসার পর প্রথম দেখা হয় পাবনা জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি আব্দুস সাত্তার লালু’র সাথে। তিনি মকবুল হোসেন সন্টুকে দেখে দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যাবার কথা বলেন। তিনি বলেন ক্যাম্পে অবস্থানরত নেতৃবৃন্দ তাকে দেখলে নক্সাল হিসেবে তার নির্ঘাত মৃত্যু হবে। সেখানে এমন অভিযোগে অনেককে হত্যা করা হয়েছে। যাইহোক সেখান থেকে ছাত্রলীগ নেতা আব্দুস সাত্তার লালু কৌশলে পিছন দিক দিয়ে মকবুল হোসেন সন্টুকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন। পরে তাঁর কথা জানাজানি হলে গোটা ক্যাম্প তন্ন তন্ন করে খোঁজ করা হয়েছিল। সেদিন তাঁকে পাওয়া গেলে নির্ঘাত মৃত্যু হতো।

এরপর সেখান থেকে পালিয়ে করিমপুর এলাকায় যান। সেখানে ঈশ্বরদীর এক পরিচতজনের সহযোগিতায় করিমপুর ট্রানজিট ক্যাম্পে আশ্রয় পান। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর মেহেরপুর মহকুমার তৎকালীন এসডিও ( বর্তমান জ্বালানী ও খনিজ উপদেষ্টা) তৌফিক এলাহি চৌধুরী আসেন মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করতে। সবাইকে দাঁড় করিয়ে উনি জিজ্ঞাসা করেন, এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া বা ডিগ্রি পাশ কেউ আছেন কিনা? সেখানে এমন কেউ না থাকায় প্রায় শতাধিক ছেলেকে বাছাই করা হয়। এরমধ্যে মকবুল হোসেন সন্টু ছিল বি,এ পরীক্ষার্থী বাকীরা ম্যাট্রিক বা আরো নীচের। প্রথমেই মকবুল হোসেন সন্টুকে পছন্দ করেন। তিনি ছিলেন দলের মধ্যে উচ্চ শিক্ষিত এবং সুদর্শন। এরপর বাছাইকৃতদের করিমপুর থেকে কলকাতা সংলগ্ন কল্যানীতে আনা হয়। সেখান থেকে ব্যারাকপুর আনা হয়। তারপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর ট্রাকে তুলে বিহার প্রদেশের চাকুলিয়ায় নেওয়া হয়। পরেরদিন থেকে শুরু হয় উচ্চতর প্রশিক্ষণ। সেখানে একমাস ধরে ট্রেনিং প্রদানের পর তাঁদের ৭ নং সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টারে আনা হয়।

মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলায় ৭ নং সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টারে ক্যাপ্টেন গিয়াসের অধীনে রাজশাহী এবং চাঁপাই নবাবগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় তাঁরা অনেক যুদ্ধে অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ছোট বড় অনেকগুলি অপারেশন করেন। উল্লেখযোগ্য অপারেশন ছিল, রাজশাহী-চাঁপাই প্রধান সড়কে শীতলাই ব্রীজ উড়িয়ে দেওয়া, চাঁপাই নবাবগঞ্জের অভায়া ব্রীজ ও রাজশাহীর কাটাখালি ব্রীজ অপারেশন করেন। এছাড়া নভেম্বর মাসে প্রথম সপ্তাহে সারদা পুলিশ একাডেমি আক্রমণ করা হয়। এরপর নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার সিদ্ধান্ত নেন, পাবনার জেলার অভ্যন্তরে এফ.এফ বাহিনীর একটি বড় দলকে পাঠানো হবে। উল্লেখ্য তখন পর্যন্ত পাবনায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত মুজিববাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা দায়িত্বে ছিলেন।

নভেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার থেকে ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন এর নির্দেশে বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন সন্টুকে কমান্ডার নিযুক্ত করে প্রায় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার একটি দল ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে পাবনায় প্রবেশ করার নির্দেশ দেন। এরপর তাঁরা পদ্মা নদী পার হয়ে ঈশ্বরদী এবং পাবনার চরাঞ্চলে এসে উপস্থিত হন। তাঁরা পাবনা প্রবেশের পরেরদিন ২৭ নভেম্বর বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুলের নেতৃত্বে সংঘটিত শানির দিয়াড় যুদ্ধে অংশ নেন। শানির দিয়াড় যুদ্ধ শেষে তিনি এবং তাঁর দল সুজানগর উপজেলা এলাকায় অবস্থান নেন। তখন সুজানগর উপজেলায় মুজিববাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ ইকবাল এবং উপপ্রধান জহুরুল ইসলাম বিশু সহ বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান করছিলেন। তাঁরা সম্মিলিত ভাবে সুজানগর এবং পাবনা সদর উপজেলার একটি বড় অঞ্চল জুড়ে তৎপরতা চালাতে থাকে। ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সুজানগর যুদ্ধ শেষ করে তারা পাবনা অভিমুখে রওয়ানা হন। ১৪ ডিসেম্বর সুজানগর থানা মুক্ত করার পর ১৫ ডিসেম্বর পাবনা মুক্ত হয়। ১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশের বিজয় অর্জন হয়। স্বাধীনতার পরে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র সমর্পনের পুর্ব পর্যন্ত জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন পরিচালনা করতেন। সেই হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন সন্টু পাবনা সদর থানার অফিসার ইন চার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। এরপর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আনুষ্ঠানিক অস্ত্র সমর্পন করে তিনি সংসার জীবনে মনোনিবেশ করেন।

স্বাধীনতার পরে উনি ঢাকা বসবাস শুরু করেন। প্রথমে ব্যবসা বানিজ্য শুরু করলেও পরবর্তীতে বিদেশ চলে যান। সংসার জীবনে পাবনার শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম সারোয়ার খান সাধন এর খালা শাহানা পারভিনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন সন্টু’র ২ ছেলে ২ মেয়ে। ছেলে তৌহিদ হোসেন রনি এবং তৌফিক হোসেন বনি। বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন সন্টু নব্বইয়ের দশকে রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৬ এবং ৮৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে পাবনা -২ ( সুজানগর -বেড়া) থেকে দুইবার এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালে পাবনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মনোনীত হন। তাঁর জীবনকালে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইটালি, জার্মানী, সুইজারল্যান্ড, ইরান, মিশর, ইরাক, কুয়েত, জর্ডান, লেবালন, ভারত, নেপাল, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং সহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করেছেন। এছাড়া তিনি সৌদি আরবে গমন করে হজ্জ পালন করেছেন। এই ক্ষণজন্মা বীর মুক্তিযোদ্ধা স্ত্রী, পুত্র ও পরিজনসহ পাবনা শহরের থানা পাড়ায় নিজ বাসভবনে বসবাস করছেন।
পরিশেষে বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন সন্টু’র জন্য প্রত্যাশা মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি সরূপ তাঁর জীবদ্দশায় পাবনার কোন স্থাপনা বা সড়ক নামকরণ করে এই বীরের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হোক।

(সমাপ্ত)
লেখক পরিচিতি –
আমিরুল ইসলাম রাঙা
রাধানগর মজুমদার পাড়া
পাবনা।




সাংবাদিকতার সাড়ে তিন যুগ

।। এবাদত আলী।।
(তিন)
(পূর্ব-প্রকাশের পর)
আগেই উল্লেখ করেছি, আমার বাড়ি পাবনা শহর থেকে দুরে অবস্থিত হওয়ায় আমি বাহাদুরপুর গোপালপুরে জায়গির থাকতাম। আমার বাড়ি বাঙ্গাবাড়িয়া-বাদলপাড়া থেকে গোপালপুর যাবার পথ-ঘাটের বর্ণনা দেওয়াই সুকঠিন। কারণ আমার বাড়ির পালানে নামলেই জমির আইল পথ। সড়ক বা রাস্তা বলতে যা বুঝায় তার কিছুই ছিলোনা। গাঁও-গেরামের মধ্য দিয়ে হালট বা ডহর নামে যে সরকারি রাস্তা তার কোনটাই ঠিক ছিলোনা। সেই রাস্তায় কেবল গরু-মহিষের গাড়ি চলাচলের কারণে তাকে গাড়ির নিরিখ বলা হতো। যাকে বলে খানা-খন্দক। বাড়ি থেকে বের হবার পর জমির আইল পথ ধরে চলতে হতো। কো কোন জমির মধ্যখান দিয়ে পথ। জনগণের চলাচলের সুবিধার জন্য আইলের ঘোরা পথের বদলে এই পথ। কোন কোন জমির মালিক আবার এটা পছন্দ করতোনা, তাই সেই পথে খেজুর, বাবলা, ডেফল কিংবা আগুন জ্বলা গাছের কাঁটা বিছিয়ে রাখতো। ওই পথে চলতে গিয়ে স্পঞ্জের ফিতা ছিঁড়ে যেতো। তাই মোটর গাড়ির টায়ারের সেন্ডেল যার নাম ছিলো অক্ষয় কেম্পানির চটি, তাই পায়ে দিয়ে চলতে হতো। কেউ কেউ আবার খড়ম পায়ে দিয়ে পথ চলতো। তবে অধিকাংশই খালি পায়ে চলাফেরা করতে ভালো বাসতো।

একবার আমি জায়গির বাড়ি যাবার পথে রূপপুর ও ঘরনাগড়া গ্রামের লোকদের নিকট জানতে পারি যে, এলাকার আখ ক্ষেতের আখ শেয়ালে কামড়িয়ে রস চুষে নিয়ে দারুন ক্ষতি করছে। এলাকার কৃষকদের প্রধান ফসল হলো আখ। পরিপক্ক আখ কলে মাড়াই করে তা থেকে প্রথমে রস এবং সেই রস থেকে গুড় তৈরি করে বিক্রয়ের মাধ্যমে সংসারের খরচ-পাতি চালায়। তাই অনেকে শিয়ালের হাত থেকে আখ রক্ষার জন্য রাত জেগে পাহারা দেয়।

এই ঘটনা আমার মনে বেশ দাগ কাটে। মনে মনে ভাবি এলাকার কৃষকদের সার্থ রক্ষায় এটাতো একটা খবর হয়। তাই দীর্ঘ সময় ধরে সাজিয়ে-গুছিয়ে একটি খবর লিখে ফেলি। প্রথমে কাঠ পেন্সিল দিয়ে লিখি। তারপর তা কাটা-কুটা করে ফ্রেস করে ফাউন্টেন পেন বা ঝরণা কলাম দ্বারা লিখে আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক আব্দুল হামিদ টিকে স্যারের নিকট নিয়ে যাই। হামিদ স্যার খবরটি মনোযোগসহকারে পড়ে একটু মৃদু হেসে আমার লেখা খবর শুধরে দিলেন।

অর্থাৎ আমি লিখেছিলাম, ‘পাবনা সদর মহকুমার মালিগাছা ইউনিয়নের রূপপুর ও ঘরনাগড়া গ্রামের হাজার হাজার বিঘা জমির আখ শিয়ালে খাইয়া ফেলিতেছে। শিয়াল কর্তৃক আখ খাইয়া ফেলায় কৃষকেরা দিশাহারা হইয়া পড়িতেছে। তাহারা কি করিবে তাহা কিছুই ভাবিয়া ঠাহর করিতে পারিতেছেনা। এলাকার শিয়ালগণ দল বাঁধিয়া একজোট হইয়া আখ ক্ষেতের মধ্যে প্রবেশ করিয়া আখ কামড়াইয়া কামড়াইয়া রস চুষিয়া লওয়ায় আখের গাছ শুকাইয়া মরিয়া যাইতেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি আমার সামনেই খবরটি শুধরিয়ে দিলে আমি তখন বুঝতে পারি যে, আমার লেখায় বহু সংখ্যক ভুল রয়েছে। আমি বুঝতে পারি যে, শিয়াল আখ খেয়ে ফেলতে পারেনা। শুধু রস চুষে নেয়। এছাড়া যখন লেখা হয়েছে দল বেঁধে তখন আর একজোট হয়ে লেখার কোন প্রয়োজন ছিলোনা। আবার হাজার হাজার বিঘা জমির পরিবর্তে এলাকার অধিকাংশ আখের জমি লেখা উচিত ছিলো। এমনি ভুলের জন্য আমি নিজে নিজে লজ্জা পাই এবং সেদিনের রিপোর্টটির কথা মনে হলে এখনো আমার হাসি পায়।

এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেলো। কোন এক উদীয়মান কবি কয়েক লাইন কবিতা লিখে একজন প্রতিষ্ঠিত কবির নিকট নিয়ে গিয়ে একটু সংশোধন করে দিতে বলেন। কবিতাটির প্রথম লাইন ছিলো: কপাল ভিজিয়া গেলো/ দু নয়নের জলে।’ এর পরের লাইন মিলাতে পারেননি। তখন প্রতিষ্ঠিত কবি তার উৎসাহ যাতে নষ্ট না হয় তাই তিনি আরেক লাইন লিখে দিলেন, যা দাঁড়ায় ‘‘ কপাল ভিজিয়া গেলো /দু নয়নের জলে। কবিকে উব্দা করে ঝুলাও আম্র গাছের ডালে।’’ অর্থাৎ কপালের স্থলে কপোল লিখলেই কেবল চোখের জল গন্ড বেয়ে পড়তো।’’ আমার দশাও যেন তাই।

যাক সেকথা। ১৯৬৯ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে সর্বপ্রথম বাংলা অনার্স বিভাগ চালু হয়। আমি বাংলা অনার্সে ভর্তি হই। মোট ১২ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে ক্লাশ শুরু হয়। কিন্তু বেশি দিন আর কলেজে পড়া সম্ভব হয়না। হঠাৎ করেই পাবনা কালেক্টরেটের অধীনে রাজস্ব বিভাগে চাকরি হওয়ায় আমি এবছর ২২ এপ্রিল সরকারি চাকরিতে যোগদান করি। ফলে লেখা-লেখির অধ্যায় চালু থাকলেও সাংবাদিকতা করার সখ একেবারেই উবে যায়।

এরই মাঝে একটি অযাচিত ঘটনা ঘটে যায়। পাকিস্তান সরকার আমাদের ৬শ জনকে চাকরি থেকে বিনা কারণে ছাঁটাই করে, এবং ১৯৭১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকারি দপ্তরের সকল চার্জ বুঝে দিবার জন্য টেলিগ্রামে আদেশ দেয়। টেলিগ্রাম পাবার পর নির্ধারিত তারিখে অফিসের চার্জ বুঝে দিয়ে দারুণ মনোকষ্ট নিয়ে বাড়ি চলে আসি। কে জানে এটাই আমার জন্য সাপে বর হবে।

আমি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যয়ণের সময় ১৯৬৮ সালে ছাত্রলীগের প্যানেলে এডওয়ার্ড কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনে বার্ষিকী সম্পাদকের পদে প্রতিদন্বিতা করি। সেসময় মোহাম্মদ নাসিম, ফজলুর রহমান পটল, সোহরাব উদ্দিন সোবা, আব্দুস সাত্তার লালু, রফিকুল ইসলাম বকুলসহ ছাত্র লীগের নেতাদের সঙ্গে আমার সখ্যতা ছিলো।

আর এসময় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে ১ মার্চ হতে সারা দেশ তখন আন্দোলনে উত্তাল। আমিও তখন সেই আন্দোলনে যোগ দেই। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য মহান মুক্তি যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি।

দীর্ঘ নয় মাস একটানা যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। তখন মুজিব নগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমদ ঘোষণা করেন যে, যেসকল সরকারি চাকুরে মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তারা যে যেখানে অর্থাৎ যে থানায় অবস্থান করছেন তারা সেখানেই যোগদান পত্র দাখিল করবেন। আামদের মুক্তিযোদ্ধার দলসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাগণ মিলে ১৫ ডিসেম্বর শাহজাদপুর থানার বাঘাবাড়িতে পাকিস্তানি হানাদারদের পরাজিত করে এলাকা শত্রু মুক্ত করে।

পরদিন আমরা শাহজাদপুরের বিভিন্ন স্কুল কলেজ এবং শাহজাদপুর ঠাকুর বাবুর কাচারি বাড়িতে (বিশ্ব কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের কাচারি বাড়ি) ক্যাম্প স্থাপন করে সিভিল প্রশাসনের কর্মকান্ড পরিচালনা করতে থাকেন। কমান্ডার আব্দুল মতিন মোহনের নেতৃত্বে তার গ্রুপের টুআইসি হিসেবে আমি শাহজাদপুর কলেজ ক্যাম্পে অবস্থান করতে থাকি এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শাহজাদপুর সার্কেল অফিসার রেভিনিউ এর অফিসে যোগদান পত্র দাখিল করি। সিও রাজস্ব গোলাম কিবরিয়া আমার চাকরির অতীত বিষয়াদি না জেনেই আমার যেগদান পত্র গ্রহণ করেন এবং ডিসেম্বর মাসের বেতন ও ঈদের অগ্রিম বোনাস প্রদান করেন।

কিছুদিন পর পাবনা জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদন করায় তিনি তা গ্রহণ করেন এবং আমাকে চাকুরিতে পুনর্বহাল করেন। সেই সঙ্গে পুর্বের চাকরিও সাভিস বুকে যোগ করার অনুমতি প্রদান করেন, যা পরবর্তীতে ২য় শ্রেণির পদমর্যাদায় পদোন্নতি পেতে আমাকে কোন বেগ পেতে হয়নি।

সে যাক। শাহজাদপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে অবস্থান কালে শাহজাদপুর পারকোলা গ্রামের যুবক সাইফুদ্দিন আহমদ ( রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজশাহী বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সাবেক পরিচালক ড. সাইফুদ্দিন আহমদ) ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে “গণবাংলা’’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং আমাকে উক্ত পত্রিকার প্রধান উপদেষ্টা করেন।

প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শাহজাদপুর পোতাজিয়ার আব্দুল মতিন মোহন এবং প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন শাহজাদপুরের এম সি এ আব্দুর রহমান। পত্রিকাটি শাহজাদপুর দ্বারিয়াপুর বাজারের আজাদ প্রেস হতে মুদ্রিত হয়ে মনিরামপুর বাজার থেকে প্রকাশিত হতো। (চলবে) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।




অর্থনীতিতে স্বস্তি ॥ করোনার মধ্যেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে অধিকাংশ সূচক

রহিম শেখ ॥ বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারীর মধ্যেই বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এই মহামারীকালেই প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ছে। গত সাড়ে তিন মাসেই প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। বিদেশী মুদ্রার সঞ্চয়ন বা

রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। চলতি অর্থবছরের মাত্র তিন মাসেই ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে রফতানি আয়। বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাব ভারসাম্যে (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) বড় উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। বেসরকারী খাতে ঋণপ্রবাহের গতিও বাড়ছে। মানুষের আয়-উপার্জন কমে গেলেও সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। দীর্ঘদিনের মন্দা পুঁজিবাজারে প্রাণ ফিরে আসতে শুরু করেছে। তবে করোনা মহামারীর ধাক্কায় ‘স্বস্তি’র অর্থনীতিতে আমদানি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। মহামারীর আগে প্রতিমাসে পণ্য আমদানিতে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হলেও এখন তা তিন বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রেমিট্যান্স, রিজার্ভ, রফতানি আয় বাড়ায় অর্থনীতিতে এক ধরনের ‘স্বস্তি’ বিরাজ করছে। কিন্তু এসব সূচকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমদানি বাড়ছে না, উল্টো অনেক কমছে। কেননা, আমদানির সঙ্গে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান জড়িত। সরকারকে এখন বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

ইউরোপে করোনার প্রকোপ আবার বাড়ছে। তাই অর্থনীতি বাঁচাতে লকডাউন এড়িয়েই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে আবারও কড়াকড়ি আরোপ করছে কয়েকটি দেশের সরকার। করোনা মহামারী সামলাতে আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেনের ওয়েলসে নতুন করে লকডাউন কার্যকর করেছে। সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে জার্মানির বাভেরিয়া রাজ্যের একটি জেলায় লকডাউন কার্যকর করা হয়েছে। বেলজিয়াম গত সোমবার থেকে এক মাসের জন্য বার ও রেস্তরাঁ বন্ধ করে দিয়েছে। ইতালিও একই পদক্ষেপ নিয়ে মানুষকে যতটা সম্ভব ঘরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছে। পোল্যান্ডের প্রায় অর্ধেক অংশ ‘রেড জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডে বদ্ধ জায়গায় মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। গত সপ্তাহ থেকে প্যারিসসহ ফ্রান্সের নয়টি শহরে রাতব্যাপী কার্ফু জারি করা হয়েছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ চার সপ্তাহের জন্য প্যারিস এবং আরও আট শহরে রাতেরবেলা কার্ফু জারির ঘোষণা দিয়েছে। স্পেনে হঠাৎ করে আবারও বেড়েছে করোনা সংক্রমণ। সংক্রমণ কমাতে দেশটির মন্ত্রিসভা ১৫ দিনের জরুরী অবস্থা জারির নির্দেশ দিয়েছে। স্লোভাকিয়ায় গত ১৩ অক্টোবর থেকে ছয় জনের বেশি জমায়েত হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। চেক প্রজাতন্ত্র তিন সপ্তাহের আংশিক লকডাউনে যাচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হবে, তার আর্থিক জের ১২ ট্রিলিয়ন ডলারে (এক ট্রিলিয়ন=এক লাখ কোটি) গিয়ে দাঁড়াবে বলে আভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ২০২০ সালের প্রবৃদ্ধির বিষয়ে গত জুনে এ পূর্বাভাস দিয়েছে তারা। এর আগে এপ্রিলে সংস্থাটি বলেছিল, ২০২০ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ৩ শতাংশ সংকুচিত হবে। এখন তারা তা সংশোধন করে বলছে, মহামারীতে এই অঙ্ক আরও বেড়ে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হবে। আইএমএফ বলেছে, বিশ্বের ২০১৯ সালের অর্থনৈতিক অবস্থায় ফিরে আসতে আরও দুই বছর সময় লাগবে। বিশ্বের কোন বৃহৎ অর্থনীতিই মহামারী থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। সর্ববৃহৎ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিও চলতি বছর ৮ শতাংশ সংকুচিত হবে বলে আভাস দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া শুধু ইউরো ব্যবহার করে, এমন দেশগুলোর সংকোচন হবে ১০ শতাংশের বেশি। যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি সংকুচিত হবে ১০ দশমিক ২ শতাংশ। জাপানের উৎপাদন ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কম হবে। চীনের অর্থনীতি ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখতে পারে। আইএমএফ বলছে, আগামী বছর (২০২১) বিশ্ব প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে, যা এপ্রিলে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। তবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলেছে, করোনাভাইরাস মহামারীর ধাক্কা সামলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। আর এ কারণেই চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়তে পারে। করোনাভাইরাস মহামারীর দ্বিতীয় সংক্রমণের তীব্রতায় বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর পাশাপাশি ভারতের মতো দেশের অর্থনীতিও মুখ থুবড়ে পড়েছে। মোট দেশজ উদনের (জিডিপি) প্রায় চার ভাগের একভাগ হারিয়েছে প্রতিবেশী দেশটি। কোভিড-১৯ ধাক্কায় মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতের নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এসেছে বাংলাদেশের নাম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হবে এক হাজার ৮৮৮ ডলার, একই সময়ে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হবে এক হাজার ৮৭৭ ডলার।

চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এই তিন মাসে অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মহামারীর ছোবলে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) বাংলাদেশের অর্থনীতি যে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল, তা অনেকটাই কেটে গেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে বিস্ময়কর ঘটনাও ঘটতে দেখা যাচ্ছে। আমদানি ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মহামারীর আঁচ এখন আর খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। মহামারীতে আটকেপড়া প্রবাসী এই কর্মীরা ফের ফিরে যাচ্ছেন সৌদি আরবে, তাদের পাঠানো অর্থ সচল রাখে অর্থনীতিকে। জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর জনকণ্ঠকে বলেন, রেমিট্যান্স, রিজার্ভ, রফতানি আয় বাড়ায় অর্থনীতিতে এক ধরনের ‘স্বস্তি’ বিরাজ করছে। কিন্তু এসব সূচকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমদানি বাড়ছে না; উল্টো অনেক কমছে। সে কারণেই সতর্কতার সঙ্গে চলতে হবে এখন সরকারকে। অপ্রয়োজনী খরচ যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। সরকারকে এখন বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

সাড়ে তিন মাসে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে দেশে ॥ করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে রেমিট্যান্স কমবে বলে ধারণা করা হলেও তা উল্টো বাড়ছেই। চলতি অর্থবছরের সাড়ে তিন মাসে ৭৯৪ কোটি ১০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা গত অর্থবছরের পুরো সময়ে আসা রেমিটেন্সের প্রায় অর্ধেক। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম ১৫ দিনে ১২২ কোটি ৭৮ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। ২০১৯ সালের অক্টোবরে ১৫ দিনে ৮০ কোটি ডলার পাঠিয়েছিলেন তারা। আর পুরো অক্টোবর মাসে এসেছিল ১৬৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার। সব মিলিয়ে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের সাড়ে তিন মাসে (১ জুলাই থেকে ১৫ অক্টোবর) ৭৯৪ কোটি ১০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। এই অর্থ গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের পুরো সময়ের ৪৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। গত অর্থবছরে মোট এক হাজার ৮২০ কোটি ৩০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা। আর একযুগ আগে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৭৯০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছিল; এবার সাড়ে তিন মাসেই সেই অঙ্ক ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বর মাসে ২১৫ কোটি ১০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এর আগে এই মহামারীর মধ্যেই গত জুলাই মাসে ২৬০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। যা এ যাবতকালের সর্বোচ্চ। করোনাভাইরাস মহামারীর আঁচ বিশ্বের অর্থনীতিতে লাগার পর গত এপ্রিল মাসে রেমিট্যান্স কমেছিল। এরপর থেকে রেমিট্যান্স বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছিল, প্রবাসী বাংলাদেশীরা কষ্টের মধ্যেও ঈদের সময় স্বজনদের কাছে বেশি অর্থ পাঠাচ্ছেন, আর অনেকে কাজ হারিয়ে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন বলে জমানো অর্থ আগেই পাঠিয়ে দিচ্ছেন বলে রেমিট্যান্স বাড়ছে। কিন্তু আগস্টের শুরুতে কোরবানির ঈদের পরও রেমিট্যান্সের গতি থামেনি।

রিজার্ভ ছাড়িয়েছে ৪০ বিলিয়ন ডলার ॥ বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেকর্ড ভেঙ্গে চার হাজার কোটি (৪০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। দেশের ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ রিজার্ভ। গত পাঁচ মাসে সাতবার রেকর্ড করেছে রিজার্ভ। প্রতিমাসে ৪ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় হিসাবে এই রিজার্ভ দিয়ে ১০ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশী মুদ্রার মজুদ থাকতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান রিজার্ভ সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। রিজার্ভের দিক দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। যা পাকিস্তানের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

ঘুরে দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাজার ॥ দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের পুঁজিবাজার চলছে ফুরফুরে মেজাজে। মূল্যসূচকের পাশাপাশি লেনদেনেও চাঙাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০১০ সালের ধসের পর নানা উদ্যোগ নেয়ার পরও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়ায়নি। মাঝেমধ্যে এক/দুই মাসের জন্য বাজারে কিছুটা ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা গেলেও পরে আর সেটা স্থায়ী হয়নি। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আরও একটি বড় ধসের মুখে পড়ে পুঁজিবাজার। বেশিরভাগ শেয়ারের দর তলানিতে নেমে আসে। মার্চে দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে লকডাউনের মধ্যে দুই মাসের বেশি সময় বন্ধ থাকে লেনদেন। ৩১ মে থেকে দেশের পুঁজিবাজারে ফের লেনদেন শুরু হয়। মহামারী শুরুর পর গত জুনে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স যেখানে ৪ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে গিয়েছিল, বৃহস্পতিবার সেই সূচক ছিল ৫ হাজার পয়েন্ট। লেনদেন হয়েছে ৯০০ কোটি টাকার মতো। এর আগে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে ডিএসইএক্স ৫ হাজার ১০০ পয়েন্ট ছাড়িয়ে গিয়েছিল। লেনদেন উঠেছিল প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকায়। জানতে চাইলে ঢাকা স্টক একচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের কাছেও অবাক লাগছে। এই মহামারীর মধ্যে পুঁজিবাজারের ইতিবাচক ধারায় ফেরা খুব একটা প্রত্যাশিত ছিল না। আমার বিবেচনায় এখানে দুটি বিষয় কাজ করেছে। প্রথমত, বাজার অনেক পড়ে যাওয়ায় শেয়ারের দামও অনেক কমে গিয়েছিল। বাজারে আসার জন্য এটা ছিল ভাল সময়। সেই সুযোগটাই বিনিয়োগকারীরা নিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা সক্রিয় হওয়ায় সমন্বয়হীনতা কমেছে, তার সুফল পাচ্ছে বাজার। ব্যাংকে সুদের হার কমে আসায় নতুন বিনিয়োগ পাচ্ছে পুঁজিবাজার।’

বৈদেশিক লেনদেনে বড় উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ ॥ মহামারীর মধ্যেও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাব ভারসাম্যে (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) বড় উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩০ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্ত ছিল মাত্র ২০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আর ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষ হয়েছিল ৪৮৪ কোটি ৯০ লাখ (প্রায় ৫ বিলিয়ন) ডলারের বড় ঘাটতি নিয়ে। তার আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল আরও বেশি, ৫১০ কোটি ২০ লাখ ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৯৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

তিন মাসে রফতানি আয় ১০ বিলিয়ন ডলার ॥ মহামারীতে তলানিতে নেমে যাওয়া রফতানি আয় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) রফতানি আয়ের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিভিন্ন পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ ৯৮৯ কোটি ৬৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার আয় করেছে। এই তিন মাসে লক্ষ্যমাত্রা ধরা ছিল ৯৬৬ কোটি (৯.৬৬ বিলিয়ন) ডলার। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৯৬৪ কোটি ৭৯ লাখ ৯০ হাজার (৯.৬৪ বিলিয়ন) ডলার। এ হিসাবেই জুলাই-আগস্ট সময়ে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে রফতানি আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। লক্ষ্যের চেয়ে আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। করোনাভাইরাস মহামারীতে বিশ্বের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ায় গত এপ্রিলে বাংলাদেশের রফতানি আয় তলানিতে ঠেকেছিল। বিধিনিষেধ শিথিলে কারখানা খোলার পর মে মাসে রফতানি আয় কিছুটা বাড়ে, জুনে তার চেয়ে অনেক বাড়ে।

দুই মাসেই লক্ষ্যমাত্রার ৩৭ শতাংশ সঞ্চয়পত্র বিক্রি ॥ চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ৭ হাজার ৪৫৫ কোটি ৫ লাখ টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এই অঙ্ক গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের একই সময়ের দ্বিগুণেরও বেশি। গত অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে ৩ হাজার ৭১২ কোটি ৩৬ লাখ টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৩ হাজার ৫৪৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। আর আগস্টে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৭৪৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা, যা এক মাসের হিসাবে গত দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১৯ সালের মার্চে ৪ হাজার ১৩০ কোটি ৭১ লাখ টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। আর গত বছরের আগস্টে এই বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪৯৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত বছরের আগস্টের চেয়ে এবার আগস্টে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়েছে ১৫০ শতাংশ।

প্রণোদনায় বেসরকারী খাতের ঋণ বাড়ছে ॥ তলানিতে নেমে আসার পর ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক বেসরকারী খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি। গত আগস্ট মাস শেষে বেসরকারী খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ১ হাজার ৬৭৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা গত বছরের আগস্টের চেয়ে ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বেসরকারী খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ২০ শতাংশ। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বেসরকারী খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমে এসেছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেসরকারী খাতে ঋণপ্রবাহে ১৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারী খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। গত অর্থবছরের মুদ্রানীতিতেও এই একই লক্ষ্য ধরা ছিল, বিপরীতে ঋণ বেড়েছিল ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় সরকার সোয়া লাখ কোটি টাকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল, সেগুলোর বাস্তবায়নে গতি আসায় বেসরকারী খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।

গতি ফিরেনি আমদানিতে ॥ অন্য সব ক্ষেত্রের মতো গতি আসেনি আমদানিতে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে ৭৪৩ কোটি ২০ লাখ ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ কম। মহামারীর আগে প্রতিমাসে পণ্য আমদানিতে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হলেও এখন তা তিন বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। আর তাতে বিনিয়োগে বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা; যার ফল হবে কর্মসংস্থান কমে যাওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য ৭৩৬ কোটি ডলারের এলসি (ঋণপত্র) খোলা হয়েছে। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের ওই দুই মাসে ৯৫০ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল। এ হিসাবে দুই মাসে এলসি খোলার পরিমাণ কমেছে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, খাদ্যপণ্য ছাড়া অন্য সব পণ্যের এলসি খোলার পরিমাণই কমেছে। শিল্প স্থাপনের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানির এলসি খোলার পরিমাণ কমেছে ২৫ শতাংশ। গত বছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ৯৯ কোটি ২৮ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল। এই বছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে তা ৭৪ কোটি ৫২ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য গত বছর ওই দুই মাসে ৩২০ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল। এবার খোলা হয়েছে ২৮৬ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের। শতকরা হিসাবে আমদানি কমেছে ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশ। একইভাবে শিল্প খাতের মধ্যবর্তী পণ্য আমদানির এলসি খোলার পরিমাণ কমেছে ১৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। জ্বালানি তেল আমদানির এলসি কমেছে ৫৩ দশমিক ১৩ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য পণ্যের কমেছে ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, জুলাই-আগস্ট সময়ে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১৮ শতাংশ। গত বছরের এই দুই মাসে যেখানে ৮৯৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল, এবছর একই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ৭৩৬ কোটি ডলারের এলসি। গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছিল; জিডিপির ৩১-৩২ শতাংশে আটকে ছিল। আমদানি কমা মানে বিনিয়োগ কমে যাওয়া। আর বিনিয়োগ কমা মানে কর্মসংস্থান কমে যাওয়া। সে কারণেই সতর্কতার সঙ্গে চলতে হবে এখন সরকারকে। অপ্রয়োজনীয় খরচ যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য এমন কথা ইতোমধ্যে বলেছেনও। সরকারকে এখন বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে হবে।




ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে পাবনার বিপ্লবী বীর রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ী

।। আমিরুল ইসলাম রাঙা।।

ব্রিটিশ শাসিত অবিভক্ত ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করার অপরাধে ইংরেজরা পাবনার বিপ্লবী বীর রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ীকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছিল। যেমন ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছিল ক্ষুদিরাম, সুর্যসেন সহ শত শত ভারতবাসীকে। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। হাজার হাজার মানুষকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে আন্দামান দ্বীপে পাঠিয়েছে। প্রায় দুইশত বছর ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান সহ সকল ধর্মের মানুষ লড়াই করেছে। লড়াই করেছে বাঙালী, বেলুচ, পাঠান, শিখ, চাকমা, মারমা সহ সকল জাতি।

আমিরুল ইসলাম রাঙা

১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ইংরেজদের এদেশ বিতাড়িত করার জন্য সকল শ্রেণীর মানুষ আন্দোলন করেছে। কখনো প্রতিবাদ আবার কখনো প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। কখনো আন্দোলন হয়েছে সহিংস আবার কখনো অহিংস। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে প্রথম বাঙালী মুসলিম তীতুমীর শহীদ হন। এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বাঙালী বা বর্তমান বাংলাদেশের অনেক কৃতি মানুষেরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। মাওলানা শরিয়তুল্লাহ, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, হাজী দানেশ, মাওলানা আজাদ, হাকিম আজমল খাঁ, আব্দুল গাফফার খান, ফকির মজনু শাহ প্রমুখদের কৃতিত্বের কথা ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে গিয়ে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে জেল খাটতে হয়েছে। এদেশের হাজার হাজার তরুন এবং যুবক জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

ছোটবেলায় গ্রামে বসবাসের সময় মাইকে শুনতাম সেই কালজয়ী গান। একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি। হাসি হাসি পরবো ফাঁসি – দেখবে ভারতবাসী। কলের বোমা তৈরী করে, দাঁড়িয়ে ছিলেম রাস্তার ধারে মাগো – বড়লাট কে মারতে গিয়ে, মারলাম আরেক ইংল্যান্ডবাসী। শনিবার বেলা দশটার পরে – জজকোর্টেতে লোক না ধরে মাগো, হলো অভিরামের দ্বীপে চালান – মা ক্ষুদিরামের ফাঁসি। ছোট বেলায় এই আবেগঘন এই গানের মর্মকথা বুঝতে না পারলেও সেই মর্মান্তিক ঘটনার মর্মকথা জানতে বেশীদিন লাগেনি। ইংরেজ লাটকে বোমা মেরে মারতে গিয়ে ১৮ বছর বয়সী ক্ষুদিরামকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ক্ষুদিরামের সেই ফাঁসি নেওয়ার ইতিহাস এখনো বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত করে। মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার আগে নিজের হাতে গলায় দড়ি বেঁধেছিলেন। কোন অনুশোচনা, অনুতপ্ত না হয়ে তিনি হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন।

ছোটবেলা থেকে ক্ষুদিরামের নাম শুনতাম। একটু বড় হয়ে জানলাম মাষ্টারদা সুর্যসেন এর কথা। চট্টগ্রামের এই বীরের নাম বেশী করে জানার সুযোগ হয় – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সুর্যসেন হলের নামকরণ হবার পর। পরবর্তীতে ইতিহাস থেকে জানি ইংরেজ শাসনকালে শত শত মানুষকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করার কথা। বেশ কয়েক বছর আগে বিপ্লবী বীরদের সংগ্রহশালা থেকে সংগ্রহ করি, ব্রিটিশ শাসনকালে ২৯ জন বাঙালী বিপ্লবীর তালিকা। তাদের কত তারিখে কোন জেলে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। সেখানেই চোখ আটকে যায় তালিকার ১২ নং এ থাকা নাম। বিপ্লবী বীর রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ী, বয়স – ২৬, জেলা – পাবনা, ফাঁসি দেওয়ার স্থান – গোন্ডা জেলখানা, তারিখ – ১৭ ডিসেম্বর ১৯২৭ সাল। কে এই বিপ্লবী বীর?

বিপ্লবী বীর রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ী, পিতার নাম – ক্ষিতীশ মোহন লাহিড়ী। পাবনার লাহিড়ী মোহনপুর গ্রামে বাড়ী। রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ী ১৯০১ সালের ২৩ জুন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার কাছ থেকে স্বদেশপ্রেমের দীক্ষা পান। লাহিড়ী মোহনপুর নিজ এলাকায় প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ভারতের বেনারস যান উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য। সেখানে বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন হিন্দুস্থান রিপাবলিকান এসোসিয়েশনের সাথে। যারা ব্রিটিশদের ভারত থেকে উৎখাত করার জন্য নানা বৈপ্লবিক কর্মকান্ড পরিচালনা করেন।

১৯২৫ সালের ৯ আগষ্ট লখনৌ থেকে ১৪ মাইল দূরে কাকোরি ও আলমনগর রেলস্টেশনের মাঝে একটি প্যাসেঞ্জার ট্রেনকে চেইন টেনে থামিয়ে তালা সহ সিন্দুক সরানো হয়। এই ঘটনার সাথে জড়িত রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ী সহ ১৬ জন বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ১৯২৬ সালে কাকোরী মামলা নামে বিচার কাজ শুরু হয়। বেশ কিছুদিন ধরে চলা এই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। এই মামলার রায়ে রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ী, রামপ্রসাদ বিসমিল, আসফাকউল্লা খান ও ঠাকুর রৌশন সিং এর ফাঁসির রায় দেওয়া হয়। বাকী ১২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। অতঃপর ১৯২৭ সালে ১৭ ডিসেম্বর উত্তর প্রদেশ এর গোন্ডা জেলার জেলখানাতে বিপ্লবী বীর রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করলে বিপ্লবী বীর রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ীকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। গোন্ডা জেলখানায় বিপ্লবী বীর রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ীর প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়। সেখানে তাঁর মৃত্যু দিবস যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়। তৎকালীন পাকিস্তান কিংবা আজকের বাংলাদেশে রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ীর জন্মভূমিতে তাঁকে স্মরণ করার কোন উদ্যোগ গত ৯৩ বছরেও নেওয়া হয়নি। বিপ্লবী রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ীদের মত বীরেরা ইতিহাসের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়ে আছে।

(সমাপ্ত)
লেখক পরিচিতি –
আমিরুল ইসলাম রাঙা
রাধানগর মজুমদার পাড়া
পাবনা।




করোনা কালের জীবন ধারা

।। এবাদত আলী।।
(পূর্ব প্রকাশের পর ) (৭৮)
তাক দ্রিম দ্রিম তাক, ঢোলের বাড়ি। কিংবা ‘আয়রে ছুটে আয়, পুজোর গন্ধ এসেছে, ঢ্যাং কুরাকুর ঢ্যাং কুরাকুর বাদ্যি বেজেছে।’ সঙ্গে জয় ঢাক, খোল-করতাল, কাঁশি এবং ফ্লুয়েট বাঁশিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে পুজামন্ডপে বিশেষ আবহ সৃষ্টি হয়ে থাকে। সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সমপ্রদায়ের সব চেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজার সময় প্রতিটি মন্ডপেই কম বেশি এসব বাদ্যযন্ত্র নানান সুর তোলে। ধুপ-ধোঁয়ার সুবাসে মন্দিরের পুরোহিত নিবিষ্ট মনে মন্ত্র পড়েন এবং মালা জপ করেন। নানা বয়সের সকল শ্রেণির দর্শনার্থী পুজামন্ডপে ভীড় করে থাকে।

কিন্তু বর্তমানে অতিমারি করোনাভাইরাসের প্রদুর্ভাবের কারণে আমাদের দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহৎ এই ধর্মীয় উৎসব নীরবেই পালন করতে হবে বলে সরকার তরফ হতে ২৬ দফা নিদের্শনা জারি করা হয়েছে। সত্যি কথা বলতে কি মহামারি করোনাভাইরাস পুজা-পার্বনের ওপর ও তার কর্তৃত্ব খাটিয়ে চলেছে।

দুর্গা পুজার অতীত ইতিহাস হতে জানা যায়, দুর্গা পুজা শুরু হয়েছিলো মোঘল শাসন আমল থেকেই। তখন কেবলমাত্র ধনী পরিবারগুলোই দুর্গা দেবীর পুজা-অর্চনা করতো। ইতিহাস বলছে দেবীর পুজা সম্ভবত ১৫০০ শতকের শেষ দিকে প্রথম শুরু হয়। সম্ভবত দিনাজপুর-মালদার জমিদার সপ্নাদেশের পর পারিবারিক দুর্গা পুজা শুরু করেছিলেন। অন্য সুত্রানুসারে তাহেরপুরের রাজা কংশ নারায়ন বা নদীয়ার ভবানন্দ মজুমদার বাংলায় প্রথম শারদীয়া বা শরৎ দুর্গা পুজা সংঘটিত করেন। এরপর রাজশাহীর রাজা এবং বিভিন্ন গ্রামের হিন্দু রাজারা প্রতি বছর এই পুজা-অর্চনা করে থাকেন।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যানুপাতে মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ৯০ দশমিক ৪ ভাগ। হিন্দু ৮ দশমিক ৫ ভাগ। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা শুন্য দশমিক ৬ ভাগ। খ্রিষ্টানদের সংখ্যা শুন্য দশমিক ৪ ভাগ এবং আদিবাসীদের সংখ্যা শুন্য দশমিক ১০ ভাগ। বাংলাদেশ ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হওয়ায় এখানে অবাধে যে যার ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারে। কিন্তু এবারে মহামারির কারণে শারদীয় দুর্গা পুজা সল্প পরিসরে পালন করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের মাটিতে সকল ধর্মের মানুষ অবাধে তাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে চলেছেন। কিন্তু সাবেক পুর্ব-পাকিস্তান আমলে তৎকালিন পাকিস্তান সরকার হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিমাতা সুলভ আচরণ করতো। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর অনেক হিন্দু তাদের সহায়-সম্পত্তি, ঘর-বাড়ি ফেলে ভারতের চলে যেতে বাধ্য হয়। তাদের ফেলে যাওয় সম্পত্তি পাকিস্তান সরকার শত্রু সম্পত্তি হিসেবে গন্য করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেয়। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দুদের প্রতি পাকিস্তানিদের বেশি আক্রমণ পরিলক্ষিত হয়। এদেশীয় এক শ্রেণির ধর্মান্ধ ব্যক্তি হিন্দুদের প্রতি ঈর্শাপরায়ন ছিলো যা তারা এই যুদ্ধের সময় কাজে লাগায়। তারা পাকিস্তানি সৈন্যদেরকে পথ-ঘাট দেখিয়ে বাড়িতে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে লুট-তরাজ করতো, অগ্নিসংযোগ করতো। তারা ধর্ষণ কাজে সহায়তা করে মা-বোনদেরকে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে তুলে দিতো। তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত ছিলো হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর। সেসময় বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারত বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি শরনার্থীকে আশ্রয় দেয়। মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষনের জন্য বাংলাদেশের যুবকদেরকে গেরিলা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। শুধু তাই নয় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধি ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানসহ নিজ দেশের সৈন্যদেরকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেন।

পাকিস্তানি সৈন্যদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর সহায়তায় পাকিস্তানি সৈন্যরা হিন্দুদেরকে বলতো ‘মালাউন’। সেসময় যেকোন মানুষকে তাদের নাগালের মধ্যে পেলেই বলতো তোম মুসলমান হো ইয়া মালাউন? উত্তর দিতে দেরি হলেই বলতো তোম কাপরা উতাউ (উঠাও)। তারা পরনের কাপড় তুলতে লোকজনকে বাধ্য করতো। তারা মুসলমানদেরকে বলতো তোম মুসলমান আওর হামভি মুসলমান হায়, ছব মুসলমান ভাই ভাই হায়। উ হিন্দু হায় উ মালাউন হায় উ ভি কাফের হায়। উছকো ছাত কভি দুস্তি নেহি হোতা হায়। কিন্তু পাকিস্তানি সৈন্যরা এতই বর্বর যে কি হিন্দু, কি মুসলমান, তারা কাউকেই ছাড়তোনা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার হতে মুক্তিলাভের পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলার মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি সরকার প্রধান হিসেবে দেশ সেবায় ব্রতি হন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত- যুদ্ধের পর ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস, ১৯৬৫’ শত্রু সম্পত্তি নাম পরিবর্তন পুর্বক সংশোধন করে বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৪ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্পত্তির নাম শত্রু সম্পত্তির পরিবর্তে ‘‘অর্পিত সম্পত্তি’’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকার ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর তারিখে ‘অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ (সংশোধন) আইন, ২০১১ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাশ করে। এরপর নানা জটিলতা দেখা দেওয়ায় ২০১৩ সালে ‘অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন (২য় সংশোধন ) উপস্থাপন ও পাশ করা হয়।

এতক্ষণ এ আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশ সরকার হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বার্থ শংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধিক আন্তরিক। কিন্তু চলতি শারদীয় দুর্গা উৎসবে হিন্দুদের পুজা-অর্চনার ওপর বেশ কিছু বিধি নিষেধ আরোপ করেছে। আর এটা করা হয়েছে শুধুমাত্র করোনাভাইরাসের কারণে। মহামারি করোনার কারণে এবছর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা পুজা ২৬ দফা নিদের্শনা মেনে উদযাপন করার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

নিদের্শনায় বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ২২-২৬ অক্টোবর-২০২০ শারদীয় দুর্গাপুজা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া এবছর প্রতিমা বিসর্জনে শোভাযাত্রা করা যাবেনা। বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতরি কারণে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে দুর্গাপুজা যাতে সুষ্ঠ’ভাবে অনুষ্ঠিত হয়, সে বিষয়ে বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে করতে হবে। মন্দির বা পুজা মন্ডপে আগত দর্শনার্থীদের জীবাণুমুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গহণ করতে হবে। দর্শনার্থী, ভক্ত ও পরোহিত –সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত এবং সকল দর্শনার্থীকে কমপক্ষে তিন ফুট শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে। (চলবে) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।




সাংবাদিকতার সাড়ে তিন যুগ

।।এবাদত আলী।।
(দুই)

(পূর্ব প্রকাশের পর)
এর আগেও অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম ১৯৬৬ সালে। তখন রাধানগর মজুমদার একাডেমি (আরএম একাডেমি) হতে সবেমাত্র এসএসসি পাশ করে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছি। আমার সহপাঠি বন্ধু আটঘরিয়ার নজরুল ইসলাম রবি, (বর্তমানে অবসর প্রাপ্ত মেজর জেনারেল, ডি জি এফ আই এর সাবেক ডিজি), নাটোরের কেএম মোনায়েম (স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ), শরিফ উদ্দিন শরিফ (ইশ্বরদীর চরকামালপুর হাই স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক, (মৃত), নুরুল ইসলাম নুরু (বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পাবনা সদর থানার প্রথম থানা কমান্ডার, (মৃত), গোলাম সরওয়ার খান সাধন (স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ), আব্দুর রশিদ বিশ্বাস (সাবেক প্রধান শিক্ষক দেবোত্তর কবি বন্দে আলী মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়),সহ অন্যান্যরা মিলে ‘রাধানগর ধ্রুবতারা সংঘ’ নামে একটি সংঘ গড়ে তুলি। আমাকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়।

রাধানগর ধ্রুবতারা সংঘের পক্ষ থেকে পাবনা বনমালী ইনস্টিটিউটে প্রসাদ বিশ্বাস রচিত ‘জবাবদিহি’ নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। ১৯৬৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তারিখে মঞ্চস্থ হওয়া উক্ত নাটকে আমি হাস্যরস চরিত্র ‘পিতাম্বরের’ ভূমিকায় অভিনয় করি। ওই নাটক মঞ্চায়নের খবর চিত্রাকাশ পত্রিকার পাবনাস্থ প্রতিনিধি টিআইএম রিয়াজুল করিম হিরোক তা উক্ত পত্রিকায় প্রকাশ করেন। প্রকাশিত খবরটি ছিলো নিম্নরূপ:- গত ২৯ সেপ্টেম্বর স্থানীয় বনমালী রঙ্গমঞ্চে রাধানগর ধ্রুবতারা সংঘের প্রযোজনায় তাদের প্রথম নাট্য অবদান প্রসাদ বিশ্বাস রচিত সামাজিক নাটক জবাবদিহি মঞ্চস্থ হয় রাত্রী ৮.৩০ মিনিটে। নাটকটি পরিচালনা করেন শরীফ আহমদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যক্ষ আমিনুল হক।

জবাব দিহি ধ্রুবতারা সংঘের প্রথম অবদান, তাছাড়া প্রায় সমস্ত শিল্পীরই প্রথম মঞ্চবতারণ, তাই এ নাটকের ভুলত্রুটির সমালোচনা করতে চাইনা অতি দুরের দৃষ্টিকোণ থেকে। তাই নিঃসন্দেহে তাদের এ প্রচেষ্টাকে সার্থক বলা যেতে পারে। তবে এই নাটকের অভিনয় ছাড়া অন্য যে সমস্ত ত্রুটি অভিজ্ঞ লোকদের হাত দিয়ে ঘটেছে তা ক্ষমাহীন ভাবেই তুলে ধরছি। পাবনার সবে ধন নীলমণি রূপ সজ্জাকর জনাব আয়েন উদ্দিন রূপ সজ্জায় আগাগোড়াই ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে আসছেন। শিল্প নির্দেশনা ও মঞ্চসজ্জায় যে লোকগুলো ছিলো তাদের ভূমিকা ঠিক বুঝতে পারলামনা। তারা কেবল নাম প্রচারের ইচ্ছা ত্যাগ করে যথাযথ দায়িত্ব পালন করলে নাটকটি যে আরো প্রাণবন্ত হতে পারতো তা নিঃসন্দেহে বলা চলে। আলোক সজ্জাতে তপন কুমার কোন নতুনত্ব দেখাতে পারেননি। সঙ্গীত পরিচালক বেতার শিল্পী হাসানুজ্জামান তালুকদার অনুষ্ঠানে সারাক্ষণ অনুপস্থিত থাকা সত্তেও তাঁর নাম বিভিন্ন ভাবে ঘোষণা করার কোন অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে পারলামনা। কণ্ঠ সঙ্গীতে গোলাম সরওয়ার খান সাধন অপূর্ব কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অংশ নেন অমলেন্দু কুমার, নুরুল ইসলাম নুরু, নজরুল ইসলাম রবি, এবাদত আলী, আব্দুস সাত্তার, ইকরামূল হক, মোনায়েম, শওকত হোসেন স্বপন, মঙ্গল কুমার, শরীফ উদ্দিন, আবুল কাসেম প্রমুখ শিল্পীগণ। পরিচালনা সার্থকতার দাবিদার। আগামীতে ধ্রুবতারা সংঘের কাছ থেকে আরো সার্থক নাটক আশা করি।

চিত্রাকাশ পত্রিকায় প্রকাশিত সেই নাট্য সমালোচনাও ছিলো আমার জন্য প্রেরণার উৎস। এছাড়া পাবনা এডয়ার্ড কলেজে অধ্যয়ন কালে আমি বার্ষিক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতা ও হাস্য-কৌতুকে অংশ নিয়ে প্রায়ই প্রথম কিংবা দ্বিতীয় হতাম। একবার এই খবর পাবনা প্রেসক্লাবের সাংবাদিক রবিউল ইসলাম রবি ‘দৈনিক সংবাদে’ প্রকাশ করলে অর্থাৎ উক্ত খবরে আমার নাম ছাপা হওয়ায় আমি ওই পত্রিকা খানি উপযাচক হয়ে অনেকেকেই দেখিয়েছিলাম এবং সযতনে রেখে দিয়েছিলাম।

খবরের কাগজে সাংবাদিকতা করা কিংবা তাতে লেখালেখি করার সখের আরেকটি কারণ ছিলো, তাহলো আমি বাল্যকাল থেকেই গল্প-কবিতা লিখতাম। আর যখন পাবনা রাধানগর মজুমদার একাডেমিতে (আর এম একাডেমী) দশম শ্রেণিতে পড়ি তখন একাডেমির নীচ তলায় পূর্ব পাশের হল রুমে ৬ষ্ঠ হতে দশম শ্রেণির সকল ছাত্রদের নিয়ে প্রধান শিক্ষক আজিজুল হকের সভাপতিত্বে (বাড়ি শাহজাদপুরের পোতাজিয়া বর্তমানে মৃত) একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ওই সমাবেশে আমাকে ছাত্র সংসদের জেনারেল সেক্রেটারি বা জিএস নির্বাচিত করা হয়। শুধু তাই নয়, আমাকে বার্ষিকী সম্পাদকের ও দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আরএম একাডেমির আমিই প্রথম জিএস এবং প্রথম বার্ষিকী সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করি। আমার সম্পাদনায় আর এম একাডেমী হতে সর্বপ্রথম স্কুল বার্ষিকী বের হয়। আরএম একাডেমীর ইংরেজি শিক্ষক জহুরুল হকের তত্বাবধানে ১৯৬৭ সালে এই বার্ষিকী প্রকাশ পায়। বার্ষিকীতে আমার লেখা রম্য রচনা “হায়না” তখন পাঠক মহলে দারুন উপভোগ্য হয়, ফলে আমার পরিচিতি অনেকাংশেই বৃদ্ধি পায়। যার ফলশ্রুতিতে আমার সহপাঠি বন্ধু আব্দুস সাত্তার (ভাঙ্গুড়া হাজী জামাল উদ্দিন কলেজের সাবেক অধ্যাপক (মৃত) সহ আবুল কাসেম মৃধা (আরিফপুর ফাজিল মাদরাসার সাবেক প্রভাষক (মৃত)), এবি সিদ্দিক হোসেন (মৃত) এবং আরো অনেকে মিলে পাবনা থেকে “দিগন্তিকা” নামে একটি পত্রিকা প্রকাশে সচেষ্ট হই। গঠন করা হয় দিগন্তিকা সম্পাদনা পরিষদ। এই পরিষদের সভাপতি হন রাজশাহী ইন্টারমিডিয়েট কলেজের অধ্যাপক মুহম্মদ হাবি বুন্ন নবী। সহ-সভাপতি এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র আব্দুল হাই বিজু, প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন কলেজের অধ্যাপক মুহম্মদ ইদরিস আলী। পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন মুহম্মদ আব্দুস সাত্তার এবং আমাকে সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়।

দিগন্তিকা পত্রিকায় যাঁরা লিখতেন তাঁরা হলেন, অধ্যাপিকা ফিরোজা বেগম, অধ্যাপক কামরুজ্জামান, অধ্যাপক একেএম হাসানুজ্জামান, অধ্যাপক হাবি বুন্নবী, অধ্যাপক ইদরিস আলী, অধ্যাপক আব্দুল হামিদ টিকে, আরো যাঁরা লিখতেন তাঁরা হলেন, মনোয়ার হোসেন জাহেদী , সামসুর রহমান, সোরহাব হোসেন খান, সৈয়দ আব্দুল হাই, এবি সিদ্দিক, এবাদত আলী, আবু দাউদ, ফরিদা বেগম, সৈয়দ ফয়জুল হাসান, কুদ্দুস হাসান ফজলে, আখতারুজ্জামান, আবুল কাসেম মৃধা প্রমুখ। দিগন্তিকা পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় শিশুতোষ কবি বন্দে আলী মিয়া আর্শীবাণী লিখেছিলেন, তিনি লিখেছিলেন, ‘‘নতুন পথের নবীন পথিক/ তোমার দিগন্তিকা/ খ্যাতির মাল্য কন্ঠে পরাবে/ ভালে দেবে জয়টিকা।’’

এসময় পাবনা থেকে “আমার দেশ” নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ হতো। পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশক এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যাপক ‘‘চলন বিলের ইতি কথা’’র লেখক আব্দুল হামিদ টিকে। আমার দেশ একই সময় পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি থেকে উর্দু ভাষায় “হামারা ওয়াতন” এবং লন্ডন থেকে ইংরেজি ভাষায় “ আওয়ার হোম” নামে প্রকাশিত হতো। হামিদ স্যারের সাথে সাক্ষাৎ করে আমি ওই পত্রিকায় লেখা ছাপানোর জন্য অনুরোধ করলে তিনি শুধু লেখাই নয় সেই সাথে গুরুত্বপূর্ণ খবরাখবরও পাঠাতে বলেন। স্যারের কথায় খবর লেখার অনুপ্রেরণা লাভ করি। কিন্তু পত্রিকায় খবর লেখার কলাকৌশল সম্পর্কে তখন আমার নুন্যতম ধারণাটুকুর ও জন্ম হয়নি। তাই একাকি ভাবতে থাকি কিভাবে খবর লেখা যায়। (চলবে)

এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।




দেশের সাফল্য- বাইরে শোরগোল, ভেতরে নিরব

।।অজয় দাশগুপ্ত।।
ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের শিরোনাম দিয়েছে- ‘চীন তো অনেক দূর, ক্ষুধা সূচকে পাকিস্তান-বাংলাদেশের থেকেও পিছিয়ে ভারত’। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে পাকিস্তান ও ভারত উভয় দেশের চেয়ে যথেষ্ট ভালো অবস্থানে বাংলাদেশ। এটাও লক্ষণীয় যে লাল-সবুজের দেশ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ বেশ ভালো ব্যবধানেই পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। যেমন দিয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, জিডিপি, শিক্ষার হারসহ অনেক সূচকে। কিন্তু আনন্দবাজার পত্রিকা বাংলাদেশের আগে ক্ষুধা সূচকে পাকিস্তানের নাম রেখেছে ‘শত্রুতার’ কারণে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাস্কেট কেস কিংবা বটমলেস বাস্কেট হিসেবে উপহাসের শিকার হয়েছে। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ কিছু লোকের কাছে বেশ উপভোগ্য শব্দ ছিল। পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও ভারতের চেয়ে আর্থ-সামাজিক নানা সূচকে আমরা পিছিয়ে ছিলাম। কিন্তু আমরা নিজেদের চেষ্টায় ভালো অবস্থানে যেতে পেরেছি। এ যে বড় অর্জন। এর স্বীকৃতিও মিলছে।

‘ভারত, পূর্ব দিকে তাকাও: বাংলাদেশ ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে পেছনে ফেলে দিচ্ছে। আমাদের (ভারতের) জন্যও শিক্ষণীয়’- এটা ছিল ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়ার ১৫ অক্টোবরের সম্পাদকীয় নিবন্ধের শিরোনাম। আগের দিন (১৪ অক্টোবর) আনন্দবাজার পত্রিকার শিরোনাম ছিল- ‘পড়ছে ভারত! মাথা পিছু উৎপাদনে ‘‘অচ্ছে দিন’’ যাচ্ছে বাংলাদেশে’।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু বলেছেন- ‘এমার্জিং ইকোনমির যে কোনো দেশের এগিয়ে যাওয়া ভালো সংবাদ। বাংলাদেশ ২০২১ সালে মাথা পিছু জিডিপিতে এগিয়ে যাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে ৫ বছর আগে জিডিপিতে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে ২৫ শতাংশ এগিয়ে ছিল।

দি প্রিন্ট-এর প্রধান সম্পাদক খ্যাতিমান সাংবাদিক শেখর গুপ্ত ১৫ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে বলেছেন- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এর চলতি অর্থ বছরের প্রতিবেদন ভারতের অর্থনীতির অ্যাকিলিস হিল বা সবচেয়ে দুর্বল স্থান চিহ্নিত করে দিয়েছে। এ সংস্থার আয়না ভারতের জন্য বড়ই নিষ্ঠুর!

ভারতের জাতীয় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী টুইট বার্তায় বলেছেন- ‘গত ৬ বছরে বিজেপির বিদ্বেষমূলক জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতির দুর্দান্ত সাফল্য হলো- বাংলাদেশ ভারতকে ছাপিয়ে যেতে চলেছে’।

আইএমএফ বলেছে- ভারতের মাথা পিছু জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপি দাঁড়াবে ১ হাজার ৮৭৭ ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকার কিছু বেশি)। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মাথা পিছু উৎপাদন হবে ১ হাজার ৮৮৮ ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা)।

বাংলাদেশের কাছে এমন হার ভারতের ক্ষমতাসীনদের জন্য দুঃস্বপ্ন বৈকি। এটাও লক্ষণীয় যে ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশের অর্জনকে ইতিবাচক মূল্যায়ন করা হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারকে দেওয়া হয়েছে সাধুবাদ। একইসঙ্গে বাংলাদেশের প্রদর্শিত পথ থেকে শিক্ষা গ্রহণেরও আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু অদ্ভূত ব্যাপার বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এর তেমন প্রতিফলন নেই। কোথাও তেমন আলোচনাও আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

করোনা হানা দেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত সংস্থা ও ব্যক্তিরা বরং নেতিবাচক দিকগুলোকেই বেশি বেশি সামনে এনেছে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে বিবিসির আকবর হোসেনের এক প্রতিবেদনের কথা। তিনি প্রশ্ন তোলেন- ‘বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প টিকে থাকতে পারবে?’ রফতানি আয়ের ৮৩ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। বছরে রফতানির পরিমাণ ৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি। কিন্তু সামনে কেবলই দুঃসময়।

বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক ওই সময়েই বিবিসিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমকে বলেছেন- ‘কোনো ক্রেতাই এখন প্যান্ট-শার্ট কিনবে না, কিনবে খাবার ও ওষুধ’। প্রতিদিন টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে তার উদ্ধৃতি দিয়ে খবর থাকত- শত শত কোটি ডলারের রফতানি আদেশ বাতিল হয়ে গেছে। আরও বাতিল হচ্ছে।

১ এপ্রিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম খবর প্রকাশ করে- পোল্ট্রি শিল্পে ক্ষতি ১৬০০ কোটি টাকা ছাড়াবে। ৫ এপ্রিল ইত্তেফাকের একটি খবরের শিরোনাম- ‘জাহাজনির্মাণ শিল্প ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে’। আরেকটি দৈনিকে খবর প্রকাশ হয়- পরিবহন খাতের ৮০ লাখ শ্রমিকের সহায়তায় কেউ এগিয়ে আসে নাই।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ বা সিপিডি বলেছে- ২০১৯-২০ অর্থ বছরে জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ২.৫ শতাংশে নেমে যাবে, যা ৩০ বছরে সবচেয়ে কম। বেকারের সারিতে নতুন কত কোটি নারী-পুরুষ নাম লেখাবে- গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হয়েছে নিয়মিত। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। ছিল ‘রিলিফ চোর’দের ফায়দা লোটার তৎপরতা। কিন্তু সবার অলক্ষ্যে অর্থনীতির চাকা যে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে সে বিষয়টি অনেকটা আড়ালেই থেকে যায়।

আইএমএফ-এর প্রতিবেদন ভারতকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশ যে ঝঞ্ঝা-ঝড়-দুর্বিপাকেও মাথা নোয়াবার নয়- সেটা কি সকলে উপলব্ধি করে?

শেখর গুপ্ত আইএমএফ-এর ঝাঁকুনি দেওয়া প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনার সময় গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত স্বাতী নারায়নের এক প্রতিবেদনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ওই সময়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারের এক মন্ত্রী বিদ্বেষপ্রসূতভাবে বলেছিলেন- ‘নাগরিকত্ব প্রদান করা হলে বাংলাদেশের অর্ধেক লোক ভারতে চলে আসবে’। স্বাতী নারায়ন প্রশ্ন তুলেছিলেন- কেন আসবে? শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাড়িতে টয়লেট, মা ও শিশু মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা, স্কুল-কলেজে ছাত্রী ভর্তি, নারী কর্মী, সাক্ষরতার হার- এ সব অনেক সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে। তারা বিনামূল্যে প্রতি বছর চার কোটির বেশি ছাত্রছাত্রীকে পাঠ্যবই দিচ্ছে। বাংলাদেশ কেবল মাথা জিডিপিতেই ভারতের থেকে সামান্য পিছিয়ে। শেখর গুপ্ত বলেছেন- এখন জিডিপিতেও ভারতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

শুধু এ বছর নয়, সামনের জন্য যে ভবিষ্যদ্বাণী আইএমএফ করেছে, সেটাও নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য সুখকর হয়নি। সংস্থাটি বলছে- আগামী বছর ভারতের জিডিপি মাথা পিছু হবে ২০৩০ ডলার, বাংলাদেশের ১৯৮৯ ডলার। বাংলাদেশকে পেছনে ফেলার আনন্দ স্থায়ী হবে না। কারণ ২০২৪ সালে দুই দেশের জিডিপি সমান হয়ে যাবে, বাংলাদেশ এগিয়ে থাকবে পয়েন্টের ব্যবধানে। আর পরের বছর, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াবে ২৭৫৬ ডলার, ভারতের ২৭২৯ ডলার।

এটা পূর্বাভাস, ঠিকঠাক হবেই- এমন কথা নেই। গড় জিডিপিতে ১০-১৫ হাজার কোটি টাকার মালিক আর হতদরিদ্রকে সমান করে দেখানো হয়, এটাও ভুললে চলবে না। শ্রীলংকার মাথাপিছু জিডিপি ২০২০ সালেই ৩৭০০ ডলার, চীনের প্রায় ১১ হাজার ডলার। এ তথ্যের পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে- বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নানা সমস্যা আছে। দুর্নীতি-অনিয়ম বিস্তর। ধর্মান্ধ অপশক্তি বার বার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

আইএমএফ-এর পূর্বভাস প্রকাশের পর ভারতের অনেকেই নতুন প্রেক্ষাপটে ‘বাংলাদেশ পলিসি’ নির্ধারণের অনুরোধ করেছেন। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও হেয় করার অবস্থান থেকে সরতে বলেছেন। ‘ম্যালাইন’ কোনোভাবেই নয়- বিশেষভাবে এটা তারা বলেছেন। শেখর গুপ্ত আরও বলেছেন- পাকিস্তানকে ঘিরেই যে এ অঞ্চলের বিদেশ নীতি নয়াদিল্লির, তার পরিবর্তন জরুরি। বাংলাদেশকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, ভারত ততটা দিচ্ছে না- এটাও কিন্তু অভিযোগ এবং তা অমূলক বলা যাবে না।

আইএমএফ-এর ঝাঁকুনির পর ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চের ‘বিশ্ব ক্ষুধা সূচক-২০২০’ প্রতিবেদনও ভারতের ক্ষমতাসীনদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। তারা বলেছে, গত বছর ১০৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৮৮, এবারে ৭৫-এ উঠে এসেছে। আগের তিন বছরে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল যথাক্রমে ৮৬, ৮৮ ও ৯০। অপুষ্টির হারসহ চারটি মানদণ্ড তারা বিচেনায় নেয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারতের অবস্থান ৯৪তম, পাকিস্তানের ৮৮ ও আফগানিস্তানের ৯৯। ভারত কেবল এই ভেবে সান্ত্বনা পেতে পারে- পাকিস্তান তো হারাতে পারেনি!

অজয় দাশগুপ্ত: উপ সম্পাদক, সমকাল




পাবনায় ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক রণেশ মৈত্র

।আমিরুল ইসলাম রাঙা।
পাবনার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক আলোকিত নাম রণেশ মৈত্র। ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী এক সংগ্রামী মানুষ। নির্লোভ, নিরহংকারী একজন সাদা মনের মানুষ। আপাদমস্তক রাজনীতিক চরিত্রের এই গুণী মানুষটি অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই গুণী মানুষটিকে বলা হয় পাবনার জীবন্ত ইতিহাস।

আমিরুল ইসলাম রাঙা

রণেশ মৈত্র ১৯৩৩ সালে ৪ অক্টোবর রাজশাহীর নওহাটায় তাঁর নানা বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা রমেশ চন্দ্র মৈত্র ছিলেন স্কুল শিক্ষক এবং মাতা ননীবালা মৈত্র ছিলেন গৃহিণী। পৈত্রিক নিবাস পাবনা জেলার অন্তর্গত সাঁথিয়া উপজেলার ভুলবাড়ীয়া। বাবা ছিলেন ভুলবাড়ীয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। রণেশ মৈত্র প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামে গ্রহন করেন। এরপর পাবনা শহরের গোপালচন্দ্র ইনিস্টিউট ( জিসিআই) ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৫০ সালে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাশ করে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন। তিনি ১৯৫৫ সালে এডওয়ার্ড কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৫৯ সালে বিএ পাশ করেন। পরবর্তীতে আইন বিষয়ে ডিগ্রী লাভ করেন।

রণেশ মৈত্র ১৯৪৮ সালে জিসিআই স্কুলে পড়ার সময় ভাষা আন্দোলনে জড়িত হন। একই সময়ে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যপদ গ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালে এডওয়ার্ড কলেজে পড়াশুনার সময় জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে এডওয়ার্ড কলেজ ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেই সময়ে প্রগতিশীল ছাত্রনেতাদের নিয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন শিখা সংঘ গঠন করেন। যার নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল মতিন (লাল মিয়া), কামাল লোহানী, জয়নুল আবেদীন খান, আনোয়ারুল হক প্রমুখ। ১৯৫২ সালে পাবনায় ভাষা আন্দোলনের সময় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ছিলেন ছাত্রলীগের নেতা আব্দুল মোমিন তালুকদার। তাদের সাথে যৌথভাবে ভাষা আন্দোলন করেন। ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমান পাবনা সফরে আসলে রণেশ মৈত্র সহ তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন নেতাদের সাথে বৈঠক করেন।

ভাষা সংগ্রামী রণেশ মৈত্র তাঁর রাজনৈতিক জীবনে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান, শেরে বাংলা ফজলুল হক সহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সংষ্পর্ষে যাবার সুযোগ পান। ভাষা আন্দোলনের পরে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাথে ছাত্রনেতা হিসেবে রণেশ মৈত্র একাধিক নির্বাচনী সভায় বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করার পর সরকার গঠন এবং পরবর্তীতে সরকার ভেঙ্গে গেলে অনেক নেতার সাথে ভাষা সংগ্রামী রণেশ মৈত্র গ্রেপ্তার হন। ১৯৫৫ সালে রণেশ মৈত্র কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ থেকে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ন্যাপ গঠন করলে রণেশ মৈত্র ন্যাপে যোগ দেন। ১৯৬৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) বিভক্ত হলে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বধীন ন্যাপে রণেশ মৈত্র যোগ দেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জোয়ার-ভাটার মত ও পথের পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একদলীয় শাসন ব্যবস্থাকল্পে বাকশাল গঠন করলে ন্যাপ বিলুপ্ত করে বাকশালে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক মৃত্যু বরনের পর ১৯৭৮ সালে আবার ন্যাপ পুনর্গঠন হলে রণেশ মৈত্র ন্যাপে ফিরে যান। ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ন্যাপ কয়েক দফা ভাঙ্গন হলে ১৯৯৩ সালে ড. কামাল হোসেনের সাথে গনফোরামে যোগ দেন। রণেশ মৈত্র ২০১৩ সাল পর্যন্ত গনফোরাম কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং পাবনা জেলা কমিটির সভাপতি ছিলেন। ২০১৩ সালে গনফোরাম ভেঙ্গে গেলে দলের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ ভট্টাচার্যের সাথে ঐক্য ন্যাপ গঠন করেন। বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত রণেশ মৈত্র ঐক্য ন্যাপের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং পাবনা জেলা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ভাষা সংগ্রামী রণেশ মৈত্রের জীবনে বিফলতা থেকে সফলতা বেশী। শৈশব থেকে আর্থিক অসচ্ছলতা ছিল বেশী সময়। সেটাও তাঁর স্বভাবগত কারনে। নিজের সংসার জীবনের চিন্তা না করে সেই স্কুলে পড়ার সময় থেকে গরীব-দুখী মানুষের চিন্তা বেশী করেছে। সকল সময়ে তাঁর নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভেবে মানুষের জন্য রাজনীতি করেছে। আর সেই রাজনীতি করতে গিয়ে জীবনকালে প্রায় ১৫ বার গ্রেপ্তার হয়েছেন। জীবনের প্রায় ১০ বছর জেলে কাটিয়েছেন। তবে এই জেলজীবনের গল্প আজ জীবনের ইতিহাস হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী থাকাবস্থায় আইন বিষয়ে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বসে। সেই সময়ে রাজশাহী জেলখানা থেকে ঢাকা জেলখানায় নেওয়া হলে তাঁকে রাখা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেল এর সাথে আরেকটি সেলে। সেখানে বঙ্গবন্ধুর সাথে পুনর্বার দেখা হয়। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে ঘনিষ্ঠতার মাত্রা বেড়ে যায়। বঙ্গবন্ধু রচিত কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু অন্তত ছয় জায়গায় রণেশ মৈত্রের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন। ঐ সময়ে রণেশ মৈত্রের সাথে জেলগেটে বেগম মুজিব এবং আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র সাথে বঙ্গবন্ধু পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। যা আজ ইতিহাসের অংশ হয়ে বঙ্গবন্ধুর কারাগারের রোজনামচা বইয়ে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে।

ভাষা সংগ্রামী রণেশ মৈত্রের জীবনের আরেকটি অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধে পাবনার অন্যতম সংগঠক হিসেবে কাজ করা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষনের পর পাবনায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ শুরু করেন। পাবনায় মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ, ছাত্রলীগ, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সমন্বয়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ন্যাপ নেতা হিসেবে ঐ পরিষদে আমিনুল ইসলাম বাদশা এবং রণেশ মৈত্র সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তান সৈন্যরা পাবনা শহর দখল করলে ২৭ মার্চ রাত থেকে সর্বস্তরের জনতা প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। ২৯ মার্চ সমস্ত পাকিস্তানী সৈন্যদের হত্যা করে পাবনাকে মুক্ত করা হয়। ২৯ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা জেলা হানাদার মুক্ত ছিল। ২৯ মার্চ পাবনা মুক্ত হওয়ার পর স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তে রণেশ মৈত্র, এডভোকেট আমজাদ হোসেন এবং কুষ্টিয়ার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্ত আলী রেজাকে ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগ করে সহযোগিতা পাওয়ার আশায় ভারত পাঠানো হয়। তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল কুষ্টিয়া হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। তাঁরা কলকাতায় গিয়ে নাচোলের নারীনেত্রী তৎকালীন ভারতের সংসদ সদস্য ইলা মিত্রের সাথে সাক্ষাৎ করে ভারত সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।

পরবর্তীতে ভারতের মাটিতে বসে মুজিবনগর সরকার গঠন করা হলে এবং ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলায় মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহন করে। এরপর শুরু হয় সশস্ত্র লড়াই। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের সহযোগিতায় ন্যাপ – কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন আলাদা ক্যাম্প স্থাপন করে। পাবনা অঞ্চলের জন্য নদীয়া জেলার করিমপুর নামক স্থানে ক্যাম্প করে মুক্তিযুদ্ধে ট্রেনিং গ্রহণ ও যুদ্ধ শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধের নয়মাসে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাঁদের এই ক্যাম্প পরিচালনায় আমিনুল ইসলাম বাদশা, রণেশ মৈত্র এবং প্রসাদ রায় নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার জন্য রণেশ মৈত্র এবং তাঁর স্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছেন।

ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক রণেশ মৈত্রের জীবনে আরেকটি বিষয় জড়িয়ে আছে, তাহলো সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতা। ১৯৫১ সাল থেকে শুরু করে আজ অবধি সংবাদপত্র জগতে লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসেবে বিরতিহীন ভাবে জড়িত। সংবাদপত্র জগতে রণেশ মৈত্রের নাম জানেন না এমন মানুষের সংখ্যা কম। ১৯৫১ সালে সিলেট শহর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক নও বেলাল পত্রিকা দিয়ে সাংবাদিকতার শুরু। এরপর কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সত্যযুগ এরপর ১৯৫৫ থেকে দৈনিক সংবাদ। ১৯৬১ সালে ডেইলী মর্নিং নিউজ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ডেইলী অবজারভারের পাবনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯২ সালে কিছুদিন দি নিউ নেশন এর মফঃস্বল সম্পাদক ছিলেন। এরপর ১৯৯৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দি ডেইলী স্টারের পাবনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। এরপর গত বিশ বছর ফ্রিল্যান্স হিসেবে কাজ করছেন। সংবাদপত্র জগতে কাজ করতে এসে সাংবাদিক হিসেবে দুটি অন্যন্য রেকর্ড স্থাপন করেছেন যা হাজার বছরের মধ্যে কেউ ভাঙ্গতে পারবেন না। এক ১৯৬১ সালে স্থাপিত পাবনা প্রেসক্লাবের তিনি প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং একই বছরে মফঃস্বল সাংবাদিকদের বৃহৎ সংগঠন সাংবাদিক সমিতির তিনি প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। ৬৯ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে এখনও নিয়মিত একাধিক পত্রিকা পড়েন এবং একাধিক পত্রিকায় লেখেন। আরেকটি বিরল বৈশিষ্ট্য হলো বর্তমানে ৮৭ বছরের জীবনে প্রায় নিয়মিত প্রেসক্লাবে আসেন এবং বসেন।

এই মহান মানুষটি রাজনীতি এবং সাংবাদিক জীবনে যতটুকু মনোযোগ দিয়ে কাজ করেছেন ততটুকু অমনোযোগী ছিলেন সংসার এবং কর্মজীবনে। সংসার জীবন শুরু করেছিলেন ১৯৫৯ সালে নাটোর জেলায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে করেন । স্ত্রী পূরবী মৈত্র প্রথমে গৃহিণী হিসেবে সংসারে প্রবেশ করলেও পরবর্তীতে শিক্ষকতা পেশা গ্রহণ করতে হয়। আর রণেশ মৈত্র বাবার পেশা হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করলেও কোথাও স্থায়ীভাবে কর্ম করতে পারেন নাই। প্রথম জীবনে পাকশী চন্দ্রাপ্রভা স্কুলের শিক্ষক, পরবর্তীতে পাবনার বৃহৎ ঔষধ কোম্পানীর সুপারিন্টেন্ডেন্ট। না সেসব চাকরি বেশীদিন করতে পারেননি। অবশেষে ১৯৬৯ সালে পাবনা জজকোর্টে আইনজীবী হিসেবে যোগ দেন। সেখানকার উন্নতি বলতে ১৯৭৫ সালে পাবনা বারে সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তারপর উকালতি পেশা বাদ দিয়েছেন আর নামের সাথে এডভোকেট পরিচয় ত্যাগ করেছেন।

ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক রণেশ মৈত্রের সারাজীবন ত্যাগের বিনিময়ে অর্জন সেটাও কম নয়। একজন আদর্শ সহধর্মিণী পেয়েছেন। পেয়েছেন সুশিক্ষিত সন্তান। তাঁর দুই ছেলে তিন মেয়ে। বড়ছেলে প্রবীর মৈত্র ওরফে বাবলা গত ২৫ বছর যাবত অষ্ট্রেলিয়ার সিডনীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। স্বাধীনতার পরে বুলগেরিয়া থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছেন। এরপর আমেরিকা থেকে পিএইচডি করেছেন। অষ্ট্রেলিয়ায় উচ্চ পদে চাকুরী করেন। সেখানে বাঙালী কমিউনিটির নেতা এবং সেখানে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলার নির্বাচিত হন। মেঝছেলে প্রলয় মৈত্র ওরফে বাদল। ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। বড়মেয়ে মধুমিতা মৈত্র ওরফে কাজল বর্তমানে তাঁর স্বামীর সাথে আমেরিকা করছেন। জামাতা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে কর্মরত। দ্বীতিয় মেয়ে মানবিকা মৈত্র কুমকুম পরলোকগমন করেছে। ছোটমেয়ে মৌসুমী মৈত্র কচি। রণেশ মৈত্রের চার ভাই এক বোন। তিনি বাবা মায়ের বড় সন্তান। মেঝ ভাই বীরেশ মৈত্র পাবনা পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। তৃতীয় ভাই ব্রজেশ মৈত্র পাবনা তথ্য অফিসে চাকুরী করতেন। ছোট ভাই পরেশ মৈত্র ছোটবেলা থেকে কলকাতায় বসবাস করেন। একমাত্র বোন বেঁচে আছেন এবং পাবনা শহরে থাকেন।

রণেশ মৈত্র অষ্ট্রেলিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরিয়া, কিরঘিজিয়া, ভারত, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর সহ অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। অবসরে পড়াশুনা এবং লেখালেখি করেন। তাঁর নিজের লেখা বই রূদ্র চৈতন্যে বিপন্ন বাংলাদেশ প্রকাশিত হয়েছে।
ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক রণেশ মৈত্রকে ২০১৮ সালে একুশে পদক দেওয়া হয়। তাঁকে স্মরণীয় করতে পাবনার কোন স্থাপনা এবং সড়ক নামকরণ করা হোক।

(সমাপ্ত)
লেখক পরিচিতি –
আমিরুল ইসলাম রাঙা
রাধানগর মজুমদার পাড়া
পাবনা।
১৮ অক্টোবর ২০২০




করোনা কালের জীবন ধারা

।। এবাদত আলী।।
(পূর্ব প্রকাশের পর ) (৭৭)
‘ধর্ষণ’ এক ধরণের যৌন আক্রমণ। সাধারণত, একজন ব্যক্তির অনুমতি ব্যাতিরেকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম বা অন্য কোন ধরণের যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোকে ধর্ষণ বলা হয়। ধর্ষণ শারীরিক বলপ্রয়োগ, অন্যভাবে চাপ প্রদান কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে। ভয়াবহ মহামারি, আন্তর্জাতিক সংঘাত বা যুদ্ধের সময় নিয়মতান্ত্রিকভাবেও ব্যাপক হারে ধর্ষণ (যুদ্ধকালীন সহিংসতা ও যৌন দাসত্ব) ঘটতে পারে।

আমাদের বাংলাদেশের মাটিতে যেমনটি ঘটেছিলো ১৯৭১ সালে। যখন পাকিস্তানি সৈন্যরা অতর্কিতে বাংলাদেশের নীরিহ- নিরপরাধ মানুষের ওপর জুলুম অত্যাচার শুরু করে। তারা নির্বিচারে মানুষ হত্যা, লুঠ-তরাজ, অগ্নিসংযোগ করতে থাকে, তখন এদেশীয় কিছু ধর্মান্ধ ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম রক্ষার দোহাই দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের দোসর হিসেবে কাজ করে। তাদের মাধ্যমে তখন এদেশের মা বোনের ইজ্জতের ওপর আঘাত হানা হয়। যা ছিলো অবর্ননীয় ধর্ষণ লীলা। এধরণের ঘটনাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে পাকিস্তানিদের সেইসব দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের বিচারও করা হয়। বেশ কয়েকজনকে মৃত্যুদন্ডসহ আমৃত্যু কারাদন্ডে দন্ডিত করে তা কার্যকর করা হয়েছে।

লেখক: এবাদত আলী

কিন্তু বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশে কোন হানাহানি নেই, নেই সহিংসতা। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘ দিন ধরে সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করছেন। কিন্তু অতিমারি করোনাভাইরাসের কারণে মানুষের মানবিক গুনাবলীতে কিছুটা হলেও চিড় ধরেছে। তা না হলে সৃষ্টি কুলের সর্ব শ্রেষ্ঠ প্রাণির দ্বারা পশুর মত জঘন্য আচরণ কিভাবে প্রকাশ পাচ্ছে তা ভাবতেও অবাক লাগে।

প্রতিটা ধর্ষণের পর সমাজের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন মতের ব্যখা দিয়ে থাকেন। একদল নারীর পোষাক-আশাক ও চলা-ফেরার প্রতি দোষারোপ করেন। কেউ কেউ আবার নরীকে তেঁতুলের সঙ্গে তুলনা করে জিহবায় জল আসার কথাও বলেন। অন্য দল ধর্ষকের বিকৃত মানসিকতার প্রতি দোষারোপ করেন। তাহলে এ প্রশ্ন মনে উদয় হতেই পারে যদি নারীর পোষাক-আশাক ও চলাফেরাই ধর্ষনের কারণ হয় তাহলে তিন বছরের শিশু, ছয় বছরের বালিকা কেন ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষণকারীদের বিকৃত মানসিকতা না হলে শিশু-কিশোর বয়সের বালকেরা কেন বলাৎকারের শিকার হয়।

হঠাৎ করে ব্যাপক হারে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার কারণে উৎকন্ঠা তৈরি হয়েছে নাগরিক সমাজে। সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অতিমারি মারণব্যাধি করোনাভাইরাসের প্রদুর্ভাবের সময় বেপরোয়া ধর্ষণের কারণ হচ্ছে, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়। দুষ্টচক্রের রাহুগ্রাস সর্ব্বোচ্য বেড়ে যাওয়ার কারণে অপরাধীরা বেপরোয়া অবস্থান নিয়েছে। অতি সম্প্রতি ব্যাপক হারে ধর্ষণের ঘটনাগুলোর কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ধর্ষণকারীদের মধ্যে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ না থাকায় নির্দ্ধিধায় তারা ধর্ষণ করতে উদ্যোগী হচ্ছে।
প্রযুক্তির অপব্যাবহারের ফলে দেশে ধর্ষণ বেড়ে চলেছে বলে অনেকেই মতামত ব্যক্ত করেছেন। করোনাকালে আমাদের সমাজে পারিবারিক বন্ধন কমে যাওয়া, সন্তানদের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ববোধের অভাব এবং খারাপ সঙ্গ, ধর্ষণের মত সামাজিক অপরাধ বাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিককালে প্রযুক্তির সহজ লভ্যতা ও অপব্যবহারের কারণে ফেসবুক, ইউটিউবে অবাধে পর্ণগ্রাফী দেখে অনেক পুরুষ ধর্ষণে উৎসাহিত বোধ করছে। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে দেশে পর্ণোগ্রাফি-সংক্রান্ত আইন তৈরি হলেও কোড অব কন্ডাক্ট, ইন্টারনেট কারা ব্যবহার করবে এবং এর নজরদারির বিষয়গুলো সঠিকভাবে মানা হচ্ছেনা।

পুলিশের ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইড) এব্যাপারে ভালো কিছু কাজ করলেও এ সংস্থাকে ধর্ষণ ও সামজিক অপরাধ প্রতিরোধে আরও কাজ করতে হবে। এছাড়া এধরণের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অপরাধীকে দ্রুত কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মতামত ব্যক্ত করে চলেছেন।

নোয়াখালী বেগমগঞ্জে ঘরের ভিতরে ঢুকে বিবস্ত্র করে এক নারীকে নির্যাতন ও ধর্ষণ চেষ্টার ৩২ দিন পর এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং এর আগে সিলেটের এমসি কলেজে এক গৃহবধুকে তার স্বামীর সামনে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করার পর সারা দেশে এ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। শুরু হয় আন্দোলন। পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পর ফাঁসির দাবিতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের জেলা, উপজেলায় তীব্র আন্দোলন গড় তুলেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন।

এই আন্দোলন চলার মধ্যে বেগমগঞ্জের ঘটনার ধারাবাহিকতায় গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও শিশু বলাৎকারের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার খবর প্রায় প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে ব্যাপকহারে প্রকাশ পাচ্ছে। দৈনিক প্রথম আলো গত ৭ অক্টোবর-২০২০ এর খবরে জানা যায়, সারা দেশে এখন নারীদের ওপর এত নির্যাতনের ঘটনায় সরকার পর্যন্ত বিব্রত বলে মন্তব্য করেছেন দেশের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘সরকারের মন্ত্রী পর্যন্ত বলেছেন আমরা ক্ষমতায়, আমরা এর দায় এড়াতে পারিনা। আমরা জুডিশিয়ারিতে আছি, আমরাও চাই উপযুক্ত বিচার হোক।’ সদ্য প্রয়াত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের স্মরণে আয়োজিত শোক সভায় তিনি একথা বলেন।’

বাংলাদেশে অব্যাহত ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে নারীর প্রতি সহিংসতার মামলাগুলো দ্রুত বিচারে আইন সংস্কারের আহবান জানিয়েছে জাতিসংঘ। সিলেট ও নোয়াখালীতে দুই নারীকে ধর্ষণের প্রতিবাদে দেশে ক্ষোভ-বিক্ষোভের মধ্যে ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিয়া সেপ্পো এক বিবৃতিতে এই আহবান জানান। (বিডি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম, ৭ অক্টোবর-২০২০)।

আশার কথা এই যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবনের পরিবর্তে মৃত্যুদন্ডের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনে সংশোধনী আনার উদ্যোগী ভুমিকা নিয়ে আইন সংশোধন করে ধর্ষকের শাস্তি যাবজ্জীবনের পরিবর্তে মৃত্যুদন্ডের বিধান করেছেন। এব্যাপারে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। নতুন এই অধ্যাদেশ জারির পর টাংগাইলে মাদরাসা ছাত্রী ধর্ষণের অপরাধে গত ১৫ অক্টোবর-২০২০ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ৫ জনকে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্ষণের সর্ব্বোচ্য শাস্তি দেওয়া হয় দ্রুততম সময়ে। বিভিন্ন দেশের কিছু আইন নিম্নে তুলে ধরা হলো। আরব আমিরাতে ৭ দিনের মধ্যে মৃত্যুদন্ড। সৌদি আরবে প্রকাশ্যে মৃত্যুদন্ড। উত্তর কোরিয়ায় ফায়ারিং সেকায়াডে গুলি। আফগানিস্তানে ৪ দিনের মধ্যে গুলি বা ফাঁসি। মিসরে ফাঁসি। ইরানে প্রকাশ্যে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদন্ড অথবা ফাঁসি। যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ আমৃত্যু কারাদন্ড। ভারতে ১০-১৪ রছর কারাদন্ড, বিশেষ ক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ড। মঙ্গোলিয়া- ধর্ষিতার পরিবারের হাত দিয়ে ধর্ষককে মৃত্যুদন্ড এবং গ্রিসে ধর্ষণের শাস্তি হলো আগুনে পুড়িয়ে মারা। ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন পাশ করেছে নাইজেরিয়ার কাদুনা রাজ্য। সেখানে কোন ব্যক্তি ধর্ষণ করলে তাকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে খোজা করে দেওয়া হয়। (চলবে) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।




বিচার চাইলে নারী দুশ্চরিত্র কেন?

।।লীনা পারভীন।।
গোটা দেশ এখন উত্তাল ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে। প্রতিদিন গড়ে দুটি-তিনটি করে সংবাদ আসে নারী ও শিশু ধর্ষণ ও হত্যার। পরিসংখ্যান বলে, এর মাত্রা দিনে দিনে বেড়েই চলছে। আমরা সবাই যখন সোচ্চার ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে, ভিক্টিম ব্লেইমিং চলবে না, আদালতে জেরার নামে ভিক্টিমকে হয়রানি করা যাবে না- ঠিক সেই সময়েই ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরু এক ভিডিওবার্তার মাধ্যমে ধর্ষণের বিচার দাবিতে অনশনরত এক ছাত্রীকে ‘দুশ্চরিত্রা’ বলে বক্তব্য দিয়েছেন।

কেন এই অপবাদ? কী দোষ সেই ছাত্রীর? ২১ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী নুরসহ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ছয় নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ধর্ষণে সহায়তাকারী হিসেবে মামলা করেছেন। জানা গেছে, ছাত্রীটিও একই সংগঠনের একজন সদস্য। অর্থাৎ, তিনি তারই দলীয় লোকদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। এই অভিযোগের নিষ্পত্তির জন্য তিনি অনশনের মতো কঠিন কর্মসূচিতেও গিয়েছেন। আমরা কেউই জানি না যে, এই অভিযোগ সত্য না মিথ্যা। কিন্তু একটি অভিযোগ এসেছে যার প্রক্রিয়ায় পুলিশ ইতিমধ্যে দুই জনকে গ্রেফতারও করেছে।

আমরা জানি নুর একজন প্রতিনিধি যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন এই একই ব্যানার থেকে। জাতীয় পর্যায়ের নানা ইস্যুতেও তিনি বক্তব্য দিয়ে থাকেন। চলমান ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনেও তিনি সরব আছেন রাস্তায়। তাহলে তিনি কেন একজন ভিক্টিমের চরিত্র নিয়ে কথা বলছেন? নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে সেজন্য? সেই ছাত্রীটি যদি মিথা অভিযোগও করে থাকে তাহলেও কিন্তু নুর কেন, কেউই তাকে প্রকাশ্যে ‘দুশ্চরিত্র’ বলতে পারে না। আরেকজনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার কারোই নেই। কথা বলতে চাইলে আপনি অভিযোগ নিয়ে কথা বলবেন। আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আপনাকে অবশ্যই যৌক্তিকভাবে আসতে হবে।

আমরা এটাও জানি যে অভিযোগকারী এর আগে বলেছিলেন যে নুর তাকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করবে বলে হুমকি দিয়েছিল। আজকে নুরের এই বক্তব্য কি সেটিকেই সমর্থন করছে না? আইন তার নিজের গতিতে চলবে। সেখানে প্রভাব খাটাতে গেলে আপনাকে ভুল পথেই যেতে হবে।

নুরের এই বক্তব্য আসলে আমাদের সমাজের পিছিয়ে পড়া কুপুমুণ্ডুক জনগোষ্ঠীরই বক্তব্য, যারা নারীকে কেবল দুর্বলই ভাবে না, সুযোগ পেলেই নারীর চরিত্র নিয়ে মনগড়া কাহিনী গড়তে পিছ পা হয় না। নুরের বক্তব্য একজন নারীর প্রতি মারাত্মক অবমাননাকর ও আপত্তিজনক। স্বাধীন বাংলাদেশের আইনের আশ্রয় নেয়ার অধিকার সবারই আছে। সুতরাং আমি মনে করি, নুরের এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আরেকজনের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছেন। সামাজিকভাবে হেয় করেছেন একজন নারীকে। তিনিও সমাজের প্রচলিত ধারাতেই চলতে চেয়েছেন, যেখানে যুক্তিতে না পারলে পুরুষতান্ত্রিক পেশি শক্তিকেই কায়েম করতে চায়।

আমরা আশা করি, সাবেক ভিপি নুর তার বক্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইবেন এবং ভিক্টিমকে তার অভিযোগ প্রমাণে সকল ধরনের সহায়তা দিবেন। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাইবেন, আবার আপনি নিজেই ধর্ষকের আশ্রয়দাতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ দিবেন- এটা কারোই কাম্য নয়।

নুরসহ সকল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের প্রক্রিয়া চলছে। এমন একটি মুহূর্তে নুরের এমন বক্তব্য আসলে ‘ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাই না’ টাইপ হয়ে গেল।

লীনা পারভীন- কলাম লেখক